Site Logo
English
কক্সবাজার

‘হাতিটিকে গুলি করা হয় চোখে’

মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বারবার ডাকছিল, সে যেন বুঝতে পারছিল না কেন মা আর উঠছে না।

2 min read
‘হাতিটিকে গুলি করা হয় চোখে’

রামু ও চকরিয়ার পাহাড়ি জনপদে যেন শনিবার রাতটা নেমে এসেছিল এক গভীর শোক হয়ে।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের পূর্ণগ্রাম এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে একটি মা হাতি।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রায় এক মাস আগে হাতিটিকে চোখে গুলি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানোর পর শনিবার রাত ১১টার দিকে নিঃশব্দে থেমে যায় তার জীবন।

পূর্ণগ্রামটি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি এলাকা। স্থানীয় লোকজন শনিবার বিকেলে প্রথমে আহত হাতিটিকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। তখনও তার নিঃশ্বাস চলছিল, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট ছিল না। পাশে ঘুরছিল তার তিন বছরের ছোট্ট শাবক। মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বারবার ডাকছিল, সে যেন বুঝতে পারছিল না কেন মা আর উঠছে না।

খবর পেয়ে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ঈদগাঁও রেঞ্জের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

ঈদগাঁও রেঞ্জ কর্মকর্তা উজ্জ্বল হোসেন জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা হাতিটিকে সংকটাপন্ন অবস্থায় পান। দ্রুত চিকিৎসার জন্য ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় তিনি পৌঁছাতে পারেননি। তার পরামর্শ অনুযায়ী বনকর্মীরা ওষুধ প্রয়োগ করেন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। রাত ১১টার দিকে নিভে যায় বনজঙ্গলের এক মায়ের জীবন।

কিন্তু সেই রাতের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি আসে এরপর।

মা হাতিটির মৃত্যুর কিছুক্ষণ পর পাহাড় থেকে নেমে আসে ১০ থেকে ১২টি বুনো হাতির একটি পাল। তারা মৃত হাতিটির চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। শুঁড় উঁচিয়ে ডাকতে থাকে, গর্জন করতে থাকে, যেন নিজেদের ভাষায় শোক জানাচ্ছিল সঙ্গী হারানোর বেদনা। তারপর ধীরে ধীরে আবার ফিরে যায় পাহাড়ের অন্ধকারে।

রোববার হাতিটির মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় রামু থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছে বন বিভাগ।

ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান ময়নাতদন্ত শেষে জানান, হাতিটির বাঁ চোখে প্রায় ১০ ইঞ্চি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে। সেখান থেকে একাধিক সিসার ছররা উদ্ধার করা হয়েছে। তার ভাষায়, স্থানীয়ভাবে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হাতিটিকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়েছিল। চোখের ভেতরে ছররা আটকে থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় ধীরে ধীরে মৃত্যু হয় প্রাণীটির।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ও রামু-ঈদগাঁওয়ের পাহাড়ি বনে একটি আহত হাতি শাবকসহ ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন খবর তারা পাচ্ছিলেন। কিন্তু বহু খোঁজ করেও তখন হাতিটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত মানুষ তাকে খুঁজে পেলেও, বাঁচাতে পারল না।

আর পাহাড়ি অরণ্যে হয়তো আজও কোথাও মাকে খুঁজে ফিরছে সেই ছোট্ট শাবকটি।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!