Site Logo
English
ফ্যাক্ট চেক

‘সোনা মিয়া মামলায় কী পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিলো?’- রায়ের তথ্য কী বলছে?

বে ইনসাইটের যাচাই বলছে, এই দুই তথ্যই ভুল।

4 min read
‘সোনা মিয়া মামলায় কী পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিলো?’- রায়ের তথ্য কী বলছে?

বে ইনসাইট ফ্যাক্টচেক

কক্সবাজারে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ‘সোনা মিয়া’ নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, এ তথ্য সঠিক।

কিন্তু সম্প্রতি এই মামলাকে ঘিরে প্রকাশিত জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলাটির রায় হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং মামলার পাঁচ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

বে ইনসাইটের যাচাই বলছে, এই দুই তথ্যই ভুল।

মামলাটির রায় হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর। আর পাঁচ আসামির মধ্যে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড, দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং একজনকে খালাস দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ, ‘পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড’, এই তথ্যটি সঠিক নয়।

দাবিটি কোথা থেকে এলো?

সোনা মিয়াকে ঘিরে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী খবর প্রকাশের পর দেশের প্রায় গণমাধ্যমে ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে।

কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

এরপর রায়ের পরোয়ানার ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ২৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তিনি দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন।

এই ঘটনার পর নতুন করে তদন্ত শুরু হলে বেরিয়ে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।

কিন্তু এই অনুসন্ধানের খবর করতে গিয়ে মামলার রায়ের তারিখ ও দণ্ডের ধরন নিয়ে তথ্যগত অসংগতি তৈরি হয়েছে।

রায়ের প্রকৃত তারিখ কত?

বে ইনসাইট মামলার রায়ের তথ্য অনলাইনে যাচাই করেছে এবং ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর প্রকাশিত একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে। সেই সাথে তৎকালীন পিপি ও বর্তমান পিপিসহ সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সাথেও কথা বলে বে ইনসাইট।

এসব প্রতিবেদনে রায়ের তারিখ হিসেবে স্পষ্টভাবে ২৫ নভেম্বর ২০২৫ উল্লেখ রয়েছে।

‘ইত্তেফাক’-এর ২৫ নভেম্বর ২০২৫-এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল-‘ইয়াবা পাচার মামলায় কক্সবাজারে রোহিঙ্গাসহ দু’জনের মৃত্যুদণ্ড’।

একই দিন আজকের পত্রিকা শিরোনাম করেছিলো- ‘ইয়াবা পাচারের দায়ে ২ জনের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ২ জনের’।

একই দিনের ‘যুগান্তর’-এর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, কক্সবাজারে ইয়াবা পাচার মামলায় দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় একজনকে খালাস দেওয়া হয়।

অর্থাৎ, রায়ের তারিখ নিয়ে প্রাপ্ত সকল তথ্য প্রমাণ দেয় সঠিক তারিখ ২৫ নভেম্বর ২০২৫ এর।

তাহলে কয়জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল?

মামলায় মোট আসামি ছিলেন পাঁচজন।

রায়ের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড হয় নূর মোস্তফা এবং সোনা মিয়ার।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়- আবদুল গফুর এবং মো. আইয়ুব ওরফে তৈয়ব এর।

আর খালাস পায় রামুর আবদুর রহমান।

অর্থাৎ দণ্ডের হিসাব দাঁড়ায়- ২ জন মৃত্যুদণ্ড + ২ জন যাবজ্জীবন + ১ জন খালাস = মোট ৫ আসামি।

এখানে সোনা মিয়া ছিলেন দ্বিতীয় আসামি এবং তিনিই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির একজন।

‘পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড’ তথ্যটি কীভাবে এল?

সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়।

উদাহরণ হিসেবে, প্রতিবেদ গুলোতে সরাসরি বলা হয়েছে- ‘চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে’ আদালত সোনা মিয়াসহ পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

কয়েকটি প্রতিবেদনের ভাষ্যে বলা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলার পাঁচ আসামির সঙ্গে সোনা মিয়ারও মৃত্যুদণ্ড হয়।

কিন্তু একই মামলা হলেও এসব দাবির সঙ্গে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর প্রকাশিত সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোর তথ্যের মিল নেই।

তাহলে ‘সোনা মিয়া’ কোন মামলার কোন আসামি?

মামলার নথি-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।

মামলায় দ্বিতীয় আসামি করা হয় সোনা মিয়াকে।

তবে এখানেই শুরু হয় পরিচয় নিয়ে জটিলতা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছিলেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। সদর ও রামু থানা পুলিশকে দিয়ে অনুসন্ধান করেও তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

পরবর্তীতে পুলিশের নতুন তদন্তে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত সোনা মিয়া ছিলেন না। তাঁর প্রকৃত নাম রমজান এবং তিনি সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুনে গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়া দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামিই নন।

পরে পুলিশ তদন্ত করে দুই ব্যক্তির পরিচয়, পারিবারিক তথ্য, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, ছবি ও আঙুলের ছাপের মধ্যে অমিল পায়।

কেন এই ভুলটি গুরুত্বপূর্ণ?

এটি শুধু একটি মামলার রায়ের তারিখ বা দণ্ডের সংখ্যা ভুল লেখার বিষয় নয়।

কারণ, এই মামলাকে কেন্দ্র করেই এখন সামনে এসেছে একজনের পরিচয়ে আরেকজনের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে যাওয়ার গুরুতর প্রশ্ন।

সেখানে মামলার মূল রায়ের তথ্যই যদি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র পাঠক বা দর্শকের কাছে বদলে যেতে পারে।

বিশেষ করে ‘পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড’ বললে মনে হয়, মামলায় পাঁচজনই মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন।

বাস্তবে তা হয়নি।

রায়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন দুইজন। তাঁদের একজন ছিলেন ‘সোনা মিয়া’ নামে পরিচিত আসামি। দুজন পেয়েছিলেন যাবজ্জীবন এবং একজন খালাস পেয়েছিলেন।

আর রায়টি হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নয়।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!