‘সমাজের চোখের সঙ্গে লড়াই’
ফাতেমা বলেন, সার্ফিংকে অনেকেই ‘খারাপ চোখে’ দেখেন। “এগুলো আমি শুনি না।” বরং তাঁর প্রশ্নটা আরও বড়- “একটা মেয়ে বড় হোক, তারা চায় না কেন?”

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।
সমুদ্র তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। পর্যটকদের ভিড় শুরু হয়নি সৈকতে। ভোরের আলো ফোটার আগেই সার্ফবোর্ড হাতে পানিতে নামেন কক্সবাজারের কিশোরী ফাতেমা আক্তার।
ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা। তারপর বোর্ডে উঠে ঢেউয়ের সঙ্গে ছুটে চলা।
এই দৃশ্য কক্সবাজার সৈকতে এখন প্রায় প্রতিদিনের। কিন্তু ফাতেমার কাছে এটি শুধু নিয়মিত অনুশীলন নয়, সমুদ্রের ঢেউ পেরিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন এমন এক মঞ্চের দিকে, যেখানে যাওয়ার স্বপ্নও কয়েক বছর আগে তাঁর ছিল না।
সেপ্টেম্বরে জাপানের আইচি-নাগোয়ায় হতে যাওয়া ২০তম এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো সার্ফিংয়ে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর সেই দলের নারী সদস্য হিসেবে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখতে যাচ্ছেন কক্সবাজারের দশম শ্রেণির ছাত্রী ফাতেমা আক্তার।
বাংলাদেশের কোনো নারী সার্ফার এর আগে এশিয়ান গেমসে অংশ নেননি। ফলে জাপানের সমুদ্রে ফাতেমার নামার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হবে বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এবারের এশিয়ান গেমস।
কিন্তু যে মেয়েটি দেশের হয়ে এশিয়ার সেরা সার্ফারদের সঙ্গে লড়তে যাচ্ছেন, ছয় বছর আগেও তিনি জানতেন না সার্ফিং কী।
‘সার্ফিং কী জিনিস, সেটাই চিনতাম না’
কক্সবাজারের সৈকতের কাছেই ফাতেমার বেড়ে ওঠা। বান্ধবীদের সঙ্গে সৈকতে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে একদিন তাঁর চোখে পড়ে কয়েকজন মেয়েকে।
তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন, কৌতূহল থেকে জানতে চেয়েছিলেন ফাতেমা।
উত্তর এসেছিল, ‘সার্ফিং করতে যাচ্ছি।’
শব্দটি তখন তাঁর কাছে একেবারেই অচেনা।
“সার্ফিং কী জিনিস চিনতাম না, সার্ফবোর্ড কী জিনিসও চিনতাম না,” বলেন ফাতেমা।
বান্ধবীরা তাঁকে সঙ্গে যেতে বললেন। প্রথম দিন পানিতে নামার সময় ভয় পেয়েছিলেন তিনি। সমুদ্রের ঢেউ, হাতে বোর্ড, সবকিছুই ছিল নতুন।
ক্লাবের একজন প্রশিক্ষক তাঁকে পানিতে নামান। প্রথমে বোর্ডে শুয়ে ঢেউ নেওয়া। তারপর একসময় দাঁড়ানোর চেষ্টা।
আর সেখানেই বদলে যায় গল্পটা।
“যখন ঢেউ নিছি, বোর্ডে দাঁড়াইছি, তখন আমার অনেক ভালো লেগেছে। তারপর থেকে প্রত্যেকদিন আমি আসতেছি সার্ফিংয়ে।”
সেই ভালো লাগা ধীরে ধীরে নেশায় পরিণত হয়। এরপর নেশা হয়ে ওঠে স্বপ্ন।
“সার্ফিংটা আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। আমার অনেক ভালো লাগে।”
প্রথম দিন ছিল ভয়, পরের দিনগুলো স্বপ্ন
ফাতেমার শুরুটাও খুব সহজ ছিল না।
পরিবারের অনুমতি নিয়ে প্রথমবার সৈকতে আসার সুযোগ হয়নি। কিন্তু কৌতূহল আর নতুন কিছু শেখার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে টেনে এনেছিল সমুদ্রের কাছে।
পানিতে নেমে প্রথম ঢেউ নেওয়ার সময় ভয় পেয়ে কেঁদেছিলেন তিনি।
“প্রথমবার পানিতে নামছি, একটা ঢেউ নিছি বুক নিয়ে। পরে যখন গেছি, কান্না করতে করতে ভয় লাগছিল।”
তারপর আবার বোর্ড দেওয়া হলো। দ্বিতীয়বার দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন।
“আরেকটা দিছে, আরেকটাতে দাঁড়াইতে পারি। তখন আমি অনেক খুশি।”
সেই আনন্দই তাঁকে প্রতিদিন সৈকতে ফিরিয়ে আনতে শুরু করে।
বাসায় ফিরে মায়ের প্রশ্ন, ‘কোথায় গিয়েছিলে?’
ফাতেমার উত্তর, ‘সার্ফিং করতে।’
কিন্তু ‘সার্ফিং’ যে আসলে কী, সেটি মাকে বোঝানোও তখন তাঁর জন্য কঠিন ছিল।
পরে একটি প্রতিযোগিতায় মেয়েকে সার্ফিং করতে দেখে মায়ের ভয় আরও বেড়ে যায়।
“আম্মু বলছে, এগুলো তো তুমি ডুবে যাবে। ডুবে গেলে কে দেখবে তোমাকে?”
ফাতেমার উত্তর ছিল আত্মবিশ্বাসী, “আমি সাঁতার পারি। আমার জন্য আপনাকে টেনশন করতে হবে না। আমাকে আপনি সাপোর্ট করেন।”
শেষ পর্যন্ত সেই সমর্থনই পেয়েছেন তিনি।

বাবা নেই, মা কাজ করেন, তবু থামেনি ফাতেমার বোর্ড.
ফাতেমার পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা খুব স্বচ্ছল নয়।
বাবা নেই। তিন বোন ও এক ভাইয়ের পরিবারে মা-ই সংসারের প্রধান ভরসা। জীবিকার জন্য অন্যের বাড়ি ও হোটেলে রান্নার কাজ করেন তিনি।
এমন একটি পরিবারে একটি মেয়ের সার্ফিং শেখা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না।
তার ওপর সার্ফিং বাংলাদেশের ব্যয়বহুল ও অবকাঠামো-স্বল্প খেলাগুলোর একটি। প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রস্তুতির সুযোগ আরও সীমিত।
তবু মা মেয়ের স্বপ্ন থামাননি।
কারণ ফাতেমার কাছে সার্ফিং কেবল খেলা নয়।
“সার্ফিংয়ের সঙ্গে থাকলে আমার সব চিন্তা, সব কিছু আমি ভুলে যাই।”
ঢেউয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার মুহূর্তটিই যেন তাঁর কাছে অন্য এক পৃথিবী।
“বোর্ডে দাঁড়াই, ঢেউ নিয়ে যখন বুক থেকে বোর্ডে নিচে পড়তে একদম ইচ্ছা করে না। মনে হয় শুধু বোর্ডে দাঁড়ায় থাকি।”
সমাজের চোখের সঙ্গে লড়াই
ফাতেমাকে শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গেই লড়তে হয়নি। লড়তে হয়েছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও।
কক্সবাজারের সৈকতে সার্ফবোর্ড হাতে একটি কিশোরী, অনেকের চোখেই ছিল অস্বাভাবিক দৃশ্য।
পোশাক নিয়ে মন্তব্য, সমালোচনা, কটূক্তি, এসবও শুনতে হয়েছে তাঁকে।
ফাতেমা বলেন, সার্ফিংকে অনেকেই ‘খারাপ চোখে’ দেখেন।
“সৈকতের এখানে, আমাদের পাড়া থেকে অনেক মানুষ ব্যবসা করতে আসে। তারা আমাদের পোষাক দেখে বাসায় গিয়ে একজনের সঙ্গে একজন সমালোচনা করে, অনেক কিছু বলে।”
এসব কথা শুধু ফাতেমার কানেই পৌঁছায়নি, তাঁর মায়ের কাছেও গেছে।
মাকে অনেকে মেয়েকে সৈকতে যেতে নিষেধ করেছেন।
কিন্তু ফাতেমা থামেননি।
“এগুলো আমি শুনি না।”
বরং তাঁর প্রশ্নটা আরও বড়, “একটা মেয়ে বড় হোক, তারা চায় না কেন?”
ফাতেমার বিশ্বাস, একটি মেয়েকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলে তার সাফল্য শুধু তার নিজের থাকে না, পরিবার, সমাজ এমনকি দেশের জন্যও তা হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণা।
“আমার কথা হচ্ছে, সবাই সাপোর্ট করুক। সবাই সাপোর্ট করলে মেয়েটা অনেক বড় হবে। বাংলাদেশের একটা সুনাম হবে।”
কক্সবাজারের ঢেউ আর জাপানের ঢেউ এক নয়
এবার ফাতেমার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
কক্সবাজারের সমুদ্রেই এতদিন তাঁর অনুশীলন। কিন্তু জাপানের প্রতিযোগিতার ঢেউ হবে ভিন্ন ধরনের।
ফাতেমা নিজেই পার্থক্যটা বুঝেছেন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা থেকে।
“ওখানের ঢেউগুলো হচ্ছে বড়। আমাদের ঢেউগুলো ছোট। ওখানে কোয়েম ব্রেক, আমাদের বিচ ব্রেক।”
তাই জাপানে ভালো করতে হলে শুধু আত্মবিশ্বাস যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আরও উন্নত প্রশিক্ষণ।
“আমাদের অনেক মেহনত করতে হবে। সার্ফিংয়ের সঙ্গে লেগেই থাকতে হবে।”
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সার্ফারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ফাতেমা দেখেছেন, সুযোগের পার্থক্যও কতটা বড়।
বিদেশি সার্ফারদের উন্নত বোর্ড, বড় ঢেউয়ে অনুশীলন এবং বিভিন্ন দেশে গিয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের সার্ফারদের সেই সুযোগ সীমিত।
তাই তাঁর চাওয়া খুব স্পষ্ট, বাংলাদেশের সার্ফারদের বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হোক।
“আমরা যদি কোনো একটা দেশে গিয়ে প্র্যাকটিস করতে পারি, আপনারা যদি আমাদের সাপোর্ট করেন, আমরা অনেক ভালো করব।”
তারপর একটু থেমে যোগ করেন, “আমাদের দেশের জন্য আরও অনেক ভালো কিছু, সুনাম নিয়ে আসতে পারব।”
‘আমি কখনো ভাবিনি এশিয়ান গেমসে সুযোগ আসবে’
একসময় ফাতেমার স্বপ্ন ছিল দেশের বাইরে গিয়ে সার্ফিং করা।
জাপান তো অনেক দূরের কথা।
তিনি ভাবতেন, একদিন হয়তো কোনো দেশে গিয়ে বড় ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করবেন।
“আমার অনেক স্বপ্ন ছিল অন্য দেশে গিয়ে সার্ফিং করব। আমি কখনো ভাবতে পারিনি এশিয়ান গেমসে এরকম একটা সুযোগ আসবে।”
সেই সুযোগ এখন বাস্তব।
বাংলাদেশ গত বছর এশিয়ান সার্ফিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ের জন্য জায়গা করে নেয়।
২০২৬ সালের জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় নারী বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফাতেমা নিজের জায়গা আরও শক্ত করেন। তাঁর সঙ্গে পুরুষ বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন মোহাম্মদ মান্নান।
অর্থাৎ, জাপানে শুধু ফাতেমার ব্যক্তিগত লড়াই নয়স, সঙ্গে যাচ্ছে বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের প্রথম আন্তর্জাতিক বড় স্বপ্নটিও।
যে মেয়েটিকে দেখে ফাতেমা স্বপ্ন দেখেন
ফাতেমার নিজেরও একজন আদর্শ আছে।
টেলিভিশনে একজন নারী সার্ফারের সার্ফিং দেখে মুগ্ধ হন তিনি। সেই সার্ফিং অনুসরণ করেন নিয়মিত।
তাঁরও ইচ্ছা, একদিন বাংলাদেশের মেয়েরা তাঁকে দেখে সার্ফিং শিখবে।
“টিভিতে একজন মেয়েকে ফলো করি। নাম এরিন ব্রুকস, তার সার্ফিংটা আমার অনেক ভালো লাগে। আমি চাই তাঁর মতো সার্ফিং করতে।”
এই ‘আমি পারব’ ভাবনাটাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
ক্রিকেট-ফুটবলের দেশে সার্ফিংয়ের স্বপ্ন
বাংলাদেশে ক্রিকেট কিংবা ফুটবল নিয়ে যতটা উন্মাদনা, সার্ফিং নিয়ে ততটা নয়।
কক্সবাজারে এসে অনেক পর্যটক হয়তো প্রথমবার সার্ফিং দেখেন। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছেই খেলাটি এখনও অপরিচিত।
ফাতেমা তাই জাপানে শুধু পদকের জন্য যেতে চান না।
তিনি চান মানুষ সার্ফিংকে চিনুক।
“মানুষরা এখন অন্যান্য খেলায় সার্ফিংটা তেমন কেউ চিনে না। আমি চাই সার্ফিংটা অন্যান্য খেলার মতো হোক।”
এশিয়ান গেমস তাঁর কাছে তাই নিজের পরিচিতি তৈরির মঞ্চের চেয়েও বড় কিছু।
তিনি চান, জাপানের সমুদ্রে বাংলাদেশের পতাকা দেখার পর দেশে ফিরে আরও অনেক মেয়ে সার্ফবোর্ড হাতে তুলে নিক।
—
ফাতেমার গল্প শুধু একটি কিশোরীর সার্ফিং শেখার গল্প নয়। এটি একটি মেয়ের নিজের জন্য জায়গা তৈরি করার গল্প।
যেখানে একদিকে সমুদ্রের ঢেউ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট। একদিকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বড় ঢেউ, অন্যদিকে সীমিত প্রশিক্ষণের সুযোগ। আর তার পাশাপাশি সামাজিক কটূক্তি ও মেয়েদের নিয়ে তৈরি নানা বিধিনিষেধ।
সবকিছুর মাঝেও ফাতেমা এগিয়ে চলেছেন।
ছয় বছর আগে যে মেয়েটি সার্ফবোর্ড কী, সেটিই জানতেন না, সেই মেয়েই এখন দেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে এশিয়ান গেমসের মঞ্চে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়।
জাপানের ঢেউ কক্সবাজারের চেয়ে বড় হবে, জানেন ফাতেমা।
প্রতিপক্ষরাও হবেন অভিজ্ঞ। কিন্তু ভয় পাচ্ছেন না তিনি। কারণ ভয়কে তিনি বহু আগেই চিনেছেন, সেই প্রথম দিনের সমুদ্রে।
তারপর ধীরে ধীরে শিখেছেন, ঢেউয়ের ওপর দাঁড়াতে হয় ভয়কে পেছনে ফেলে।
এখন তাঁর স্বপ্ন আরও বড়, লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে জাপানের সমুদ্রে দাঁড়াবেন তিনি।
আর বাংলাদেশের মানুষ যেন তখন শুধু একজন মেয়েকে সার্ফিং করতে না দেখে; দেখে একটি নতুন সম্ভাবনাকে।
একটি মেয়ের স্বপ্ন কীভাবে সমুদ্রের ঢেউ পেরিয়ে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে, ফাতেমা হয়তো সেই গল্পটাই লিখতে যাচ্ছেন।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!