Site Logo
English
কক্সবাজার

সংরক্ষিত বনের বুক চিরে সড়ক

“প্রকল্পটি এরই মধ্যে দখলদারদের উৎসাহিত করেছে। বিদ্যমান ট্রেইলের পাশে কেউ কেউ ঘর নির্মাণ শুরু করেছেন। গত কয়েক মাসে সংরক্ষিত বনে অবৈধ দখলের ঘটনায় বন বিভাগ ছয়টি মামলা করেছে।”

7 min read
সংরক্ষিত বনের বুক চিরে সড়ক

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।

বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী। পাহাড়, বন আর সমুদ্রঘেরা এই দ্বীপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষিত বন। সেই বনের ভেতর দিয়েই এখন নির্মাণ করা হচ্ছে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার পাকা সড়ক।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ২২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের লক্ষ্য শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাটকে কালারমার ছড়ার সঙ্গে যুক্ত করা।

কিন্তু সড়কটি কোথা দিয়ে যাচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বন বিভাগের দাবি, প্রস্তাবিত সড়কের বড় একটি অংশ সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে যাবে। সেখানে আগে যে পথটি ছিল, সেটি কোনো পাকা সড়ক নয়; গড়ে মাত্র দুই মিটার প্রশস্ত একটি সরু হাঁটা পথ, যার কিছু অংশে সীমিত পরিসরে ইটের সলিং রয়েছে।

অন্যদিকে এলজিইডির ভাষ্য, সড়কটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত এবং বিদ্যমান পথের ওপরই কাজ করা হচ্ছে।

এই দুই বক্তব্যের মাঝেই আটকে আছে মহেশখালীর সংরক্ষিত বনের ভবিষ্যৎ।

কারণ, একটি সরু ট্রেইলকে ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত পাকা সড়কে রূপ দেওয়া শুধু রাস্তা নির্মাণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড় কাটা, বনভূমি উন্মুক্ত হওয়া, অবৈধ দখল বাড়ার আশঙ্কা এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রশ্ন।

—
যে বনে এখনো ভেতরে ঢোকার পথ নেই
—

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষার পাশাপাশি অবৈধ দখল ঠেকাতে ১৯৫৭ সালে মৌজা-১২-এর ১৮ হাজার ২৮৬ একর জমিকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়।

১৭ কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্যের এই বনের সর্বোচ্চ প্রস্থ প্রায় ছয় কিলোমিটার। এখানে রয়েছে বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির গাছপালা। বনের বাসিন্দা হরিণ, অজগর, হনুমান ও বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী।

বনের দুই পাশে দৈর্ঘ্য বরাবর দুটি প্রধান সড়ক থাকলেও ভেতরের অংশে এতদিন কোনো পাকা সড়ক ছিল না।

এ কারণেই বনের প্রান্ত থেকে অবৈধ বসতি ও দখল ভেতরের দিকে ছড়িয়ে পড়লেও মাঝের দুর্গম অংশের একটি বড় অংশ তুলনামূলকভাবে অক্ষত রয়েছে বলে বন কর্মকর্তারা জানান।

এখন সেই পরিস্থিতিই বদলে যেতে পারে।

—
একটি সড়ক কীভাবে বনের ভেতর নতুন প্রবেশপথ তৈরি করবে?
—

বন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পাকা সড়ক নির্মাণ হলে এতদিন দুর্গম থাকা বনের ভেতরের অংশ মানুষের সহজ প্রবেশের আওতায় চলে আসবে।

এর ফলে কাঠ পাচার, বনভূমি দখল, অবৈধ বসতি স্থাপন এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

মহেশখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, প্রকল্পটি এরই মধ্যে দখলদারদের উৎসাহিত করেছে।

তার ভাষ্য, বিদ্যমান ট্রেইলের পাশে কেউ কেউ ঘর নির্মাণ শুরু করেছেন।

গত কয়েক মাসে সংরক্ষিত বনে অবৈধ দখলের ঘটনায় বন বিভাগ ছয়টি মামলা করেছে বলেও জানান তিনি।

অর্থাৎ আশঙ্কাটি কেবল ভবিষ্যতের নয়, বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পরই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

—
যেখানে রাস্তা শেষ, সেখানেই শুরু পাহাড় কাটা
—

প্রস্তাবিত ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়কের জেএম ঘাট অংশে ইতোমধ্যে কিছু কাজ হয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে আগে থেকেই জবরদখলকারীদের বসতি রয়েছে, সেখানে কংক্রিট পেভমেন্টের কাজ শেষ হয়েছে। কয়েকটি কালভার্টের কাজও চলছে।

তবে কালারমার ছড়া প্রান্তে এখনো কাজ শুরু হয়নি।

আর এই অংশেই রয়েছে আরেকটি বড় প্রশ্ন, পাহাড় কাটা।

বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ৫ দশমিক ৫ মিটার বা ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়ক করতে হলে দুই পাশে প্রায় ১৪ ফুট করে পাহাড় ও বনভূমি কাটতে হবে।

তিনি বলেন, এভাবে বনভূমি কাটলে তা আইনের লঙ্ঘন হবে এবং তখন বন বিভাগ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

ফলে প্রকল্পটি কেবল বনভূমির ওপর দিয়ে সড়ক বসানোর বিষয় নয়, এর একটি অংশ বাস্তবায়ন করতে হলে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতিও পরিবর্তন করতে হবে, এমন আশঙ্কা করছে বন বিভাগ।

—
আপত্তি ছিল, কাজও হয়েছে
—

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সড়ক নির্মাণ নিয়ে তারা একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছেন।

তবে সেই আপত্তির মধ্যেই কাজ চালানো হয়েছে।

জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে গত বছরের সেপ্টেম্বরে নির্মাণকাজ শুরু হয়।

বন বিভাগের আপত্তির কারণে বর্তমানে কাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে এলজিইডি।

মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেন, কিছু কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। কিন্তু বন বিভাগের আপত্তির কারণে এখন এগোনো যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, সড়কটি সরকারি গেজেটেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত বনের ভেতরের একটি পথ সরকারি গেজেটে সড়ক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলো এবং সেটি করার সময় বন বিভাগের আপত্তি কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল?

—
আদালতেও উঠেছে বৈধতার প্রশ্ন
—

সড়ক নির্মাণের বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি-বেলা।

৬ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগ পাহাড় মৌজায় প্রস্তাবিত সড়কের ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন।

এরপর ৯ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ওই নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ দেন। একই সঙ্গে সড়কের প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটারের বেশি না করার শর্তে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।

আদালত অবকাশ শেষে দুই সপ্তাহের মধ্যে মূল রিটের শুনানি করতে হাইকোর্টকে নির্দেশ দিয়েছেন।

বেলার আশঙ্কা, মূল রিটের শুনানি হতে আরও দেড় মাসের বেশি সময় লাগতে পারে। তার আগেই নির্মাণকাজের বড় একটি অংশ শেষ হয়ে গেলে বনের যে ক্ষতি হবে, তা পরে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নাও হতে পারে।

—
‘আগে থেকেই সড়ক ছিল’, রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি কতটা বাস্তব?
—

সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ছিল, বনের ভেতর দিয়ে আগে থেকেই একটি সড়ক রয়েছে এবং চলমান প্রকল্পে মূলত সেই বিদ্যমান পথটিই পাকা করা হচ্ছে।

কিন্তু বন বিভাগের বর্ণনা ভিন্ন।

তাদের দাবি, এটি কোনো বিদ্যমান পাকা সড়ক নয়। গড়ে দুই মিটার প্রশস্ত একটি সরু হাঁটা পথ, যার দুই প্রান্তে সীমিত অংশে ইটের সলিং রয়েছে।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, দুই মিটার প্রশস্ত একটি হাঁটার পথকে ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত পাকা সড়কে রূপান্তর করার অর্থ শুধু পুরোনো পথের ওপর পিচ ঢালা নয়। এর জন্য প্রয়োজন হবে পথ প্রশস্ত করা, ভূমি কাটা, কালভার্ট নির্মাণ এবং স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে, একটি ট্রেইলকে কি ‘আগের সড়ক’ ধরে নিয়ে সংরক্ষিত বনের ভেতরে পাকা সড়ক নির্মাণের ভিত্তি তৈরি করা যায়?

এই প্রশ্নের উত্তরই এখন প্রকল্পটির বৈধতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

—
সংসদ সদস্যের ডিও লেটার, বন বিভাগের আপত্তি
—

প্রকল্পটি নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ মার্চের শেষ দিকে বন বিভাগকে একটি আধা-সরকারি চিঠি ‘ডিও লেটার’ দিয়ে প্রকল্পটিতে বাধা না দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।

অন্যদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সংরক্ষিত বনের ভেতরে পাকা সড়ক নির্মাণ নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।

এ অবস্থায় একটি প্রশ্নও সামনে আসে, একটি সংরক্ষিত বন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক সুপারিশের সঙ্গে বন বিভাগের আইনগত অবস্থানের সংঘাত হলে কোন প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা?

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সংসদ সদস্য আলমগীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

—
যে বনে দখল ঠেকানোই কঠিন
—

মহেশখালীর এই সংরক্ষিত বন এখন এমনিতেই চাপের মধ্যে।

বন কর্মকর্তারা জানান, দুই পাশের প্রধান সড়ক ধরে অবৈধ বসতি ইতোমধ্যে প্রায় আধা কিলোমিটার পর্যন্ত বনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

কিছু জায়গা পরিষ্কার করে পানবরজও গড়ে তোলা হয়েছে।

এই বাস্তবতায় বনের মাঝখান দিয়ে আরেকটি স্থায়ী সড়ক তৈরি হলে দখলদারদের জন্য ভেতরের অংশে যাতায়াত সহজ হবে, এমন আশঙ্কা বন কর্মকর্তাদের।

তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজ বন্ধ করতে চাওয়ায় বন কর্মকর্তাদের ভয় দেখাতে ঠিকাদাররা স্থানীয় লোকজন ও দখলদারদের সংগঠিত করেছে।

তবে এই অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

—
উন্নয়ন কার জন্য, ক্ষতি কার?
—

সড়ক নির্মাণের পক্ষে যুক্তি হলো, জেএম ঘাট ও কালারমার ছড়ার মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে।

কিন্তু এই যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়েই কেন স্থায়ী পাকা সড়ক নির্মাণ করতে হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

কারণ, বিকল্প পথ ছিল কি না, থাকলে সেগুলো কেন বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, প্রকল্প অনুমোদনের আগে বন ও পরিবেশগত ঝুঁকি কতটা মূল্যায়ন করা হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশেষ করে যখন প্রকল্পের একটি অংশে পাহাড় কাটার প্রয়োজন হবে বলে বন বিভাগ দাবি করছে এবং একই সঙ্গে বনটির প্রান্তে অবৈধ দখল বাড়তে থাকার তথ্যও রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মহেশখালী ইউনিটের সম্পাদক আবু বক্করের ভাষায়, সড়কটি পাকা হলে পাহাড়, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

—
আইন কী বলছে?
—

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সংরক্ষিত বনের ভেতরে এ ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তাদের বক্তব্য, জাতীয় বননীতি ২০২৫ অনুযায়ী মন্ত্রিসভা ও সরকারপ্রধানের অনুমোদন ছাড়া সংরক্ষিত বনের ভেতরে এ ধরনের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে না।

উপকূলীয় বন বিভাগও জুলাইয়ের শেষ দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেছে।

তবে প্রকল্পটি কী ধরনের পরিবেশগত ও বন-সংক্রান্ত অনুমোদনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, সেই নথি এবং অনুমোদন প্রক্রিয়াটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাচাইয়ের বিষয়।

—
তদন্ত করছে প্রশাসন
—

কক্সবাজারের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জামির উদ্দিন বলেন, বিষয়টি বন বিভাগ দেখভাল করছে।

জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত একটি সড়ক কীভাবে সংরক্ষিত বনের ভেতরে অবস্থান করছে, তা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে দেখছে।

অর্থাৎ প্রকল্পের অবস্থান, অনুমোদন এবং বনভূমির সঙ্গে এর সম্পর্ক, তিনটি বিষয় নিয়েই এখন প্রশ্ন রয়েছে।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!