রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’ নয়ঃ মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বললো ঢাকা
বাংলাদেশ যে মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, রাষ্ট্রদূতকে সেটিও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গারা নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে নিজেদের দেশে ফিরে যাক। আর তারা ফিরে যাবে ‘তাদের নিজেদের পরিচয় নিয়েই’।

। বে ইনসাইট ডেস্ক ।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে উদ্বেগ জানিয়েছে ঢাকা। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে মিয়ানমারের যাচাই-বাছাই দ্রুত করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াউ সোয়ে মোয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান। সেখানেই মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
বৈঠকের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে দেওয়া বিভিন্ন তথ্য নিয়ে বাংলাদেশের আপত্তি রয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’ নয়। তাদের নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক পরিচয় রয়েছে এবং অতি সম্প্রতি মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকেই সেই পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এমন এক সময়ে, যখন ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি।
কী বলেছে মিয়ানমার?
রোববার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে।
মিয়ানমারের দাবি, যাচাই করা তথ্যের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
আর ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে দেশটি।
শুধু সংখ্যা নয়, রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়েও মিয়ানমার নতুন করে অবস্থান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী নেই। তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর এখানেই বাংলাদেশের আপত্তি সবচেয়ে স্পষ্ট।
বাংলাদেশের বক্তব্য কী?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে বলেছেন, ওই বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এবং অন্যান্য বিষয়ে দেওয়া বেশ কিছু তথ্য ‘ভুল পরিসংখ্যাননির্ভর’।
বাংলাদেশের বক্তব্য, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত নিবন্ধনেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে।
ঢাকা বলছে, দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে শুধু ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের নয়, পরে ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নতুন রোহিঙ্গাদেরও বিবেচনায় নিতে হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তথ্য যথাসময়ে মিয়ানমার সরকারকে দেওয়া হবে এবং যাচাইয়ের সময় নতুন যুক্ত হওয়া তথ্যও বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
‘নিজেদের পরিচয় নিয়েই তারা ফিরবে’
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের বিবৃতিতে সংখ্যার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি রয়েছে এবং বাংলাদেশের সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই তথ্যের সঙ্গে একমত নয়।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং তিনি তাঁর সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলবেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মিয়ানমারের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া যেন দ্রুত করা হয়, সে বিষয়েও ঢাকার পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ যে মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, রাষ্ট্রদূতকে সেটিও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
শামা ওবায়েদের ভাষায়, বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গারা নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে নিজেদের দেশে ফিরে যাক। আর তারা ফিরে যাবে ‘তাদের নিজেদের পরিচয় নিয়েই’।
নয় বছর পরও কেন আটকে প্রত্যাবাসন?
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর অভিযান ও ব্যাপক সহিংসতার মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়। এর আগে থেকেই সেখানে ছিল আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা।
বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি শিবিরে ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
রোহিঙ্গাদের ফেরাতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছিল মিয়ানমার। পরে ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগও নেওয়া হয়।
কিন্তু মিয়ানমারে ফিরে গেলে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত হবে কি না—এ নিয়ে আস্থার সংকটে প্রত্যাবাসনে রাজি হয়নি রোহিঙ্গারা।
এরপর কোভিড মহামারি, ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান এবং পরে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সংঘাত—সব মিলিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যায়।
চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগেও কয়েকবার প্রত্যাবাসনের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই বাস্তবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
এখন রাখাইনের পরিস্থিতিও আগের চেয়ে আরও জটিল। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে না।
তাহলে সামনে কী?
মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের উদ্বেগ নেপিদোতে জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের অঙ্গীকারের কথাও জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তবে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানও পরিষ্কার—শুধু তালিকা যাচাই করলেই হবে না, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
কারণ নয় বছর ধরে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা এই জনগোষ্ঠীর জন্য প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি শুধু সংখ্যা বা তালিকার বিষয় নয়।
এটি তাদের পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন।
আর সেই জায়গাতেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বক্তব্যের পার্থক্য এখনো সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে আছে।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!