Site Logo
English
শরণার্থী

‘রোহিঙ্গা’ নয় ‘রোয়াইঙ্গা’

“২০০০ বছরের ইন্ডিপেনডেন্ট আরাকান হিস্ট্রিতে বার্মা আরাকান শাসন করেছে মাত্র ৬৬ বছর”

4 min read
‘রোহিঙ্গা’ নয় ‘রোয়াইঙ্গা’

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের অস্বীকৃতির বিপরীতে ইতিহাসের বিভিন্ন নথি তুলে ধরে তাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার অস্তিত্বের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন।

তিনি বলেছেন, মিয়ানমার ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বাইরে ঠেলে দিয়েছে। তবে ব্রিটিশদের আরাকান দখলের আগেও ওই অঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে দাবি করেন তিনি।

রোহিঙ্গা পরিচয় নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গা বলে কোনো কিছু নাই। এটা রোহিঙ্গা নয় ‘রোয়াইঙ্গা’। ওরা বলে ‘আঁরা রোয়াইঙ্গা কউম’। মানে আমরা রোয়াইঙ্গা জাতি।

তাঁর ভাষায়, ‘রোহিঙ্গা’ নামটি শ্রুতিমধুরতার জন্য তৈরি, কোনো পরিচয় নয়। বরং এ জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অস্তিত্বের পক্ষে বিভিন্ন নথি রয়েছে।

তিনি বলেন, “মিয়ানমার রোহিঙ্গাদেরকে ১৯৮২ সালে সিটিজেনশিপ ল করে নন-সিটিজেন করে দিয়েছে।”

অধ্যাপক রাহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের ভিত্তি ছিল ১৮২৪ সালের আগে ওই অঞ্চলে কার পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল, সেই প্রশ্ন। তাঁর দাবি, ব্রিটিশদের আরাকান দখলের আগের সময়ের অন্তত চারটি নথিতে ওই অঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির উল্লেখ রয়েছে।

এর মধ্যে ১৭৯৯ সালে ফ্রান্সিস বুকাননের তৈরি ভাষাতাত্ত্বিক নথি, ১৮১১ সালের একটি জার্নাল, ১৮১৫ সালের একটি নৃতাত্ত্বিক নথি এবং ১৮২০ সালে ওয়াল্টার হ্যামিল্টনের প্রকাশিত বইয়ের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, এসব নথিতে আরাকান অঞ্চলে বিশেষ একটি ভাষায় কথা বলা জনগোষ্ঠীর উল্লেখ রয়েছে। ফলে ১৮২৪ সালে ব্রিটিশদের আরাকান দখলের আগেই সেখানে ওই জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায় বলে তিনি মনে করেন।

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশে হওয়া গবেষণার সমালোচনাও করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশে কয়েকটি পিএইচডি গবেষণা হলেও সেগুলোর বড় অংশ একটি নির্দিষ্ট বইয়ের ওপর নির্ভরশীল।

“অ্যাকাডেমিতে সূত্র ছাড়া দাঁড়াতে পারবেন না,” বলেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের ইতিহাসের প্রধান সূত্র হিসেবে আরাকান রাজসভার কবি দৌলত কাজী, আলাওল ও মাগন ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম ব্যবহারের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করেন রাহমান। তাঁর যুক্তি, সাহিত্য ইতিহাসের সহায়ক উপাদান হতে পারে, কিন্তু একে একমাত্র ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা একাডেমিক ভাবে যথেষ্ট নয়।

তবে রোহিঙ্গাদের পরিচয়ের পক্ষে আরও পুরোনো নথি পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আরাকানের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রসঙ্গও।

অধ্যাপক রাহমান বলেন, প্রায় দুই হাজার বছরের আরাকানের ইতিহাসে বার্মা অঞ্চলটি শাসন করেছে মোটামুটি ৬৬ বছর। ১৪০৬ থেকে ১৪৩০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৪ বছর এবং ১৭৮৪ সালে বোধপায়ার আরাকান দখলের পর ১৮২৪ সালে ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর, এই দুই সময়কে তিনি বার্মার শাসনকাল হিসেবে উল্লেখ করেন।

২০০০ বছরের ইন্ডিপেনডেন্ট আরাকান হিস্ট্রিতে বার্মা আরাকান শাসন করেছে মাত্র ৬৬ বছর

রোহিঙ্গাদের পরিচয় প্রশ্নে জাতিসংঘের ২০০৭ সালের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণে শুধু বর্তমান রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের অবস্থান বিবেচনা করা যায় না; এর সঙ্গে ইতিহাস, ভূমি, জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক বসবাস ও আত্মপরিচয়ের বিষয়ও যুক্ত।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “রাষ্ট্র মানুষের পরে এসেছে। মানুষ আগে এসেছে।” রাষ্ট্রই পরে মানুষকে নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট, ভিসা ও সীমান্তের মতো আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুরু থেকেই দ্বিপক্ষীয়ভাবে তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কাজ করে আসছে। ২০১৭ সালের আগস্টে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসার পর ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি, ১৯ ডিসেম্বর টাস্কফোর্স গঠন এবং ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি যৌথ কর্মপরিকল্পনা বা ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট তৈরির কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তবে অতীতের প্রত্যাবাসনের ধরন নিয়েও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেন।

তাঁর ভাষায়, ১৯৭৮ সালের প্রত্যাবাসন ছিল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ। অন্যদিকে ১৯৯২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা ছিল।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিয়ে আলোচনায় শুধু প্রত্যাবাসনের সময়সীমা নয়, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নটিকেও মৌলিক বিষয় হিসেবে দেখার আহ্বান জানান অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন।

তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন টেকসই করতে হলে তাদের পরিচয়, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিয়ে যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে, তার সমাধানও আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজার জেলা পরিষদ কার্যালয়ে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কতদূর’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় মূল আলোচক হিসেবে এসব কথা বলেন অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন। গবেষণাধর্মী গণমাধ্যম বে ইনসাইট ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এমবোলডেন বাংলাদেশ যৌথভাবে এ আয়োজন করে।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!