রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাম নয়, বাড়ছে জলবসন্ত; তিন মাসে আক্রান্ত ৮ হাজারের বেশি
গত তিন মাসে হাম আক্রান্ত শিশু পাওয়া গেছে ৪ জন এবং রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছে ১ জন।

বে ইনসাইট | কক্সবাজার
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হাম নয়, এখন নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ভ্যারিসেলা জোস্টার ভাইরাসজনিত রোগ জলবসন্ত (চিকেনপক্স)।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই রোগের সংক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা ক্যাম্পের ঘনবসতি ও শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের স্বাস্থ্য সমন্বয়ক ডা. তোহা ভূঁইয়া জানান, “গত তিন মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জলবসন্তে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৭৬৯ জন। অথচ গত বছরের শেষ ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৩৫৫।”
তিনি বলেন, “তুলনামূলকভাবে হাম বা রুবেলার সংক্রমণ এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত তিন মাসে হাম আক্রান্ত শিশু পাওয়া গেছে ৪ জন এবং রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছে ১ জন।”
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে হাম ও রুবেলা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জলবসন্তের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
ডা. তোহা ভূঁইয়া জানান, ক্যাম্পে বসবাসরত শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকাদান কার্যক্রম চলছে।
ঘনবসতি ও বাস্তবতা: দ্রুত ছড়াচ্ছে সংক্রমণ
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সংকীর্ণ বসবাস, একসঙ্গে অনেক মানুষের থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানতে না পারা—এসব কারণে জলবসন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা নূরজাহান বলেন, “আমার ছেলের শরীরে হঠাৎ ফুসকুড়ি ওঠে, পরে জ্বর আসে। এখন আলাদা করে রাখতে হচ্ছে, কিন্তু এক ঘরে সবাই থাকায় সেটা খুব কঠিন।”
আরেক অভিভাবক মোহাম্মদ ইদ্রিসের ভাষ্য, “একজনের হলে দ্রুত অন্যদেরও হয়ে যায়। বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
কী এই জলবসন্ত
চিকেন পক্স বা জলবসন্ত ভ্যারিসেলা-জোস্টার ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা সাধারণত শীতের শেষে ও বসন্তকালে বেশি দেখা যায়।
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে হাঁচি-কাশি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
লক্ষণ ও সংক্রমণের সময়কাল
জলবসন্তের লক্ষণ সাধারণত ১০ থেকে ২১ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায় এবং ১ থেকে ২ সপ্তাহ স্থায়ী হয়।
প্রধান লক্ষণগুলো হলো-
জ্বর
মাথাব্যথা
শরীর ম্যাজম্যাজ করা
চুলকানিযুক্ত তরলপূর্ণ ছোট ফোসকা
জলবসন্তের ধাপগুলো কীভাবে এগোয়
ইনকিউবেশন পিরিয়ড (সুপ্তাবস্থা):
ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর ১০-২১ দিন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
প্রাথমিক লক্ষণ :
ফুসকুড়ি ওঠার ১-২ দিন আগে জ্বর, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা ও মাথাব্যথা শুরু হয়।
ফুসকুড়ি বা ফোসকা পর্যায়:
প্রথমে লালচে দানা (র্যাশ)
পরে তরলপূর্ণ ফোসকা
শেষে শুকিয়ে খোসা (স্ক্যাব) হয়ে ঝরে পড়ে
আক্রান্ত হলে করণীয় কী
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত ব্যক্তির যত্নে কিছু বিষয় জরুরি-
১। আক্রান্তকে আলাদা রাখা
২। নখ ছোট রাখা, যাতে চুলকানোর ক্ষত না হয়
৩। প্রচুর পানি ও তরল খাবার গ্রহণ
৪। চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বর ও চুলকানির ওষুধ গ্রহণ
৫। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা
৬। প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবসন্ত প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভ্যারিসেলা টিকা গ্রহণ।
একই সঙ্গে সতর্কতা হিসেবে তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা ফোসকা থেকে অতিরিক্ত পুঁজ বের হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজন বাড়তি নজরদারি
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, ক্যাম্পে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেতনতা বাড়ানো, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং আলাদা রাখার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
নচেৎ, সীমিত জায়গায় বসবাসরত হাজারো মানুষের মধ্যে এই রোগ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!