যে তরুণ কেঁদেছিল আরাকানের জন্য, তাঁর যেতে হলো কানাডায়
“দ্যাট একচুয়ালি ফ্রাস্ট্রেট আওয়ার রিপ্যাট্রিয়েশন ইনিশিয়েটিভস এবং কারণ তারা তাদের দেশে ব্যাক করার চিন্তা বাদ দিয়ে রিসেটেলের চিন্তা করছে যেটি আসলে এক ধরনের ফলস ড্রিম।”

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে বসে আরাকানের কথা বলতেন রুহেল খান।
নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত এই রোহিঙ্গা তরুণের কণ্ঠে উঠে আসত হারানো ভূখণ্ডের জন্য আকুলতা, ‘ও আরাকান, তোমার জন্য হৃদয় কাঁদে।’
গানটি ছড়িয়ে পড়েছিল রোহিঙ্গা শিবিরে। লাখো মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন রুহেল।
কিন্তু আরাকানে ফেরা হয়নি তাঁর।
সম্প্রতি তৃতীয় দেশ হিসেবে কানাডায় চলে গেছেন এই রোহিঙ্গা সংগীতশিল্পী।
রুহেলের এই যাত্রা শুধু একজন মানুষের দেশান্তর নয়। এর মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে রোহিঙ্গা সংকটের একটি জটিল প্রশ্ন, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন বা রিসেটলমেন্ট কি শরণার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ, নাকি এর ফলে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে?
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশের কাছে তৃতীয় দেশে যাওয়ার সুযোগ এখন নতুন জীবনের সম্ভাবনা। আবার শরণার্থী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই সুযোগকে ঘিরে ক্যাম্পের তরুণদের একটি অংশের মধ্যে প্রত্যাবাসনের বদলে রিসেটলমেন্টের প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলছেন, রিসেটলমেন্ট কোনো অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নয়, এটি সংশ্লিষ্ট সরকারের অনুমোদন ও যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে চলা একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, কোন ধরনের শরণার্থীকে তৃতীয় দেশে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের নির্ধারিত মানদণ্ড থাকে। সেই মানদণ্ডের ভিত্তিতে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রাথমিক তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ভাগ করে।
এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়োজিত সংস্থাগুলো বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তালিকা চূড়ান্ত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যাচাই শেষে বিষয়টি আসে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের দপ্তরে। তখন ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, রোহিঙ্গাদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের অগোচরে নয়।
তবে এর প্রভাব নিয়েই উদ্বেগ কমিশনারের।
কমিশনার বলেন, দ্যাট একচুয়ালি ফ্রাস্ট্রেট আওয়ার রিপ্যাট্রিয়েশন ইনিশিয়েটিভস এবং কারণ তারা তাদের দেশে ব্যাক করার চিন্তা বাদ দিয়ে রিসেটেলের চিন্তা করছে যেটি আসলে এক ধরনের ফলস ড্রিম।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ভাষায়, ক্যাম্পের শিক্ষিত ও তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, কোনো না কোনোভাবে তারা উন্নত দেশে পুনর্বাসিত হতে পারবেন।
আর এই প্রত্যাশা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগকে জটিল করে তুলছে বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রিসেটলমেন্টের সুযোগকে ঘিরে তৈরি এই প্রত্যাশা অনেকের মধ্যে নিজ দেশে ফেরার চিন্তার বদলে তৃতীয় দেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে আসছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন করা সম্ভব নয়।
কারণ, কয়েক হাজার মানুষকে তৃতীয় দেশে পাঠানো আর পুরো একটি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বিভিন্ন দেশে পুনর্বাসিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন রিফিউজি রিসেটলমেন্ট কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ায় সেই পথ এখন কার্যত বন্ধ।
এখন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে সীমিত পরিসরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু সংখ্যাটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যার তুলনায় খুবই ছোট।
শরণার্থী কমিশনের তথ্য বলছে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭ হাজার রোহিঙ্গার ৩য় দেশে পুনর্বাসন হয়েছে।
আর এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যে জনগোষ্ঠীর কয়েক লাখ মানুষ বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন, তাদের কয়েক হাজারকে তৃতীয় দেশে পাঠানো কি সংকটের সমাধান হতে পারে?
ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা রিপ্রেজেন্টেটিভের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহর উত্তর, না।
বে ইনসাইটকে তিনি বলেন, কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে তৃতীয় দেশে পাঠানো পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো সমাধান নয়।
রোহিঙ্গাদের জন্য প্রকৃত সমাধান কী, এই প্রশ্নে তাঁর অবস্থান আরও স্পষ্ট।
তাঁর ভাষায়, শিক্ষিত হোক কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা কেউ হোক, রিসেটলমেন্ট রোহিঙ্গাদের সমাধান নয়; একমাত্র সমাধান প্রত্যাবাসন।
সৈয়দ উল্লাহর এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে আরেকটি বাস্তবতা।
রোহিঙ্গা শিবিরে প্রতি বছর নতুন প্রজন্ম জন্ম নিচ্ছে। তাদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশেই বেড়ে উঠছে। ফলে কয়েক হাজার মানুষকে তৃতীয় দেশে পাঠানো হলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।
আর সেই ভবিষ্যতের কেন্দ্রেই রয়েছে আরাকান।
রুহেল খানের গল্পটি তাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
যে তরুণ নিজের গানে আরাকানের জন্য কেঁদেছেন, যে গান রোহিঙ্গা শিবিরে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, সেই রুহেল শেষ পর্যন্ত আরাকানে ফেরার সুযোগ পাননি।
তাঁকে যেতে হয়েছে আরও দূরের এক দেশে, কানাডায়।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!