মৃত্যুদণ্ডের আসামি কি ভুল মানুষ?
আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের করা তদন্তেও তার দাবির পক্ষে তথ্য মিলেছে। পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন করে অন্য একজনের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। তার প্রকৃত নাম রমজান।

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।
কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ‘সোনা মিয়া’কে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশি তদন্ত বলছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং মৃত্যুদণ্ডের পর ২০২৬ সালের জুনে গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।
মামলার নথিতে যাকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে আসামি করে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কারাগারে থাকা সেই ব্যক্তি এখন দাবি করছেন, তিনি ওই মামলার আসামিই নন।
আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের করা তদন্তেও তার দাবির পক্ষে তথ্য মিলেছে। পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন করে অন্য একজনের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। তার প্রকৃত নাম রমজান।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত সোনা মিয়া, যিনি এখন কক্সবাজার জেলা কারাগারে আছেন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, একজনের পরিচয়ে আরেকজনের বিচার কীভাবে হলো? তদন্তকারী কর্মকর্তা যখন অভিযোগপত্রেই ‘সোনা মিয়া’র নাম-ঠিকানা সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেছিলেন, তখন তার পরিচয় নিশ্চিত না করেই কীভাবে মামলার বিচার এগোল এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড হলো?
যেভাবে শুরু
২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় করা মামলায় দ্বিতীয় আসামি করা হয় ‘সোনা মিয়া’কে।
এজাহারে তার বাবার নাম নজির আহমদ, ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়। কিন্তু মামলার তদন্তে শুরু থেকেই তার পরিচয় নিয়ে সমস্যা ছিল।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানস বড়ুয়া উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ দিয়ে অনুসন্ধান করেও তার পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
তারপরও মামলার বিচার এগিয়ে যায়।
নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান। এরপর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর মামলার রায়ে পাঁচ আসামির মধ্যে সোনা মিয়াসহ দুই আসামীর মৃত্যুদণ্ড, দুই আসামীর যাবজ্জীবন ও একজন খালাস পায়।
রায়ের পর ওই মামলায় ‘সোনা মিয়া’কে গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়। ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর এক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের ওয়ারেন্টমূলে গ্রেফতার হন একজন সোনা মিয়া।
তাকে পাঠানো হয় কক্সবাজার জেলা কারাগারে।
কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পরই বদলে যায় পুরো মামলার চিত্র।
‘আমি ওই মামলার আসামি নই’
কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিনের মধ্যে সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন। তার বক্তব্য, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং তিনি ওই মামলার আসামি নন।
বিষয়টি আদালতকে জানান জেল সুপার।
এরপর কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত পুলিশকে বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
গত ২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ২০২০ সালে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। তার প্রকৃত নাম রমজান।
একই ক্যাম্প, একই ঘর-তারপর পরিচয় বদল
পুলিশের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে তারা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় এসে একই ঘরে বসবাস করেন।
কোনো এক সময় সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন কার্ড রমজানের কাছে থেকে যায়।
পুলিশের প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন।
অর্থাৎ, মামলার নথিতে যে পরিচয় ধরে ২০২০ সালের গ্রেফতার, পরবর্তী বিচার এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে, সেই পরিচয়ের ব্যক্তি আসলে অন্য একজন, এমনটাই বলছে পুলিশের সাম্প্রতিক তদন্ত।
কারাগারের পুরোনো-নতুন তথ্যেও মিল নেই
দুই ব্যক্তির কারাগারে সংরক্ষিত তথ্য তুলনা করেও বড় ধরনের পার্থক্য পেয়েছে পুলিশ।
২০২০ সালে গ্রেফতার ব্যক্তির পিতার নাম ছিল মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। এক ছেলের নাম মোহাম্মদ আলী।
তার উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার তথ্য নথিভুক্ত ছিল।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার সোনা মিয়ার পিতার নামও মৃত নজির আহমদ। কিন্তু মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে।
ছেলের নাম ওমর ফারুক এবং মেয়ের নাম নাহিদা।
এই সোনা মিয়ার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বাম পাশে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু নাম ও বাবার নাম নয়, মা, স্ত্রী, সন্তান, উচ্চতা, ওজন এবং শারীরিক শনাক্তকরণ চিহ্নেও দুই ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
আইনজীবীর প্রশ্ন তদন্তের গাফিলতি নিয়ে
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলছেন, মামলাটির শুরু থেকে তদন্ত ও আসামির পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় গুরুতর গাফিলতির বিষয়টি এখন সামনে এসেছে।
তার ভাষায়, কোনো ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে তা যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এই মামলায় প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সোনা মিয়ার প্রকৃত নাম যে রমজান, সেটিও তদন্তে বের করা হয়নি। ফলে যে ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছিল, সে জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। আর পরবর্তীতে তার পরিবর্তে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আব্দুল মান্নানের মতে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর এবং আদালতের মাধ্যমে এর আইনগত নিষ্পত্তি জরুরি।
‘আমার স্বামী কখনো কারাগারেও যাননি’
কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, তার স্বামী কখনো কোনো মামলায় জড়াননি।
তিনি বলেন, হঠাৎ র্যাব তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর পর তারা জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবার একটি মামলায় তার স্বামীর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।
তার দাবি, তার স্বামী রোহিঙ্গা নন, রামুর বাসিন্দা। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার স্বামীর বন্ধুত্ব ছিল। ওই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছিল বলে তারা জানতেন।
কিন্তু সেই মামলায় এখন তার স্বামীকে আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এখন প্রশ্ন আদালতের সিদ্ধান্তে
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী আদালতের নির্দেশে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বুধবার, ১২ আগস্ট মামলায় সোনা মিয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের দাখিল করা প্রতিবেদন নিয়ে আদালতে আদেশ হওয়ার কথা রয়েছে।
সেই আদেশের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ও তার পরিবার।
তবে এই ঘটনায় শুধু একজন ভুল ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডের আসামি করার অভিযোগই সামনে আসছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে আরও কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান প্রশ্ন তোলেন, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া রমজান এখন কোথায়? তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই যখন সোনা মিয়ার পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি, তখন সেই পরিচয়ে বিচার কীভাবে চলল? জামিনের সময় আদালতের সামনে যে ব্যক্তি ছিলেন, তার পরিচয় কি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল? একজনের পরিচয়ে অন্য একজনের বিরুদ্ধে যদি বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়ে থাকে, তাহলে এই ভুলের দায় কার?
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!