Site Logo
English
ইলেকশন ইনসাইট

ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক হাব ধলঘাটা: উন্নয়ন প্রকল্পের ছায়ায় নির্বাচনী রাজনীতি

তবে উন্নয়নের এই জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ার অভিযোগও উঠছে।

4 min read
ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক হাব ধলঘাটা: উন্নয়ন প্রকল্পের ছায়ায় নির্বাচনী রাজনীতি

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ইউনিয়নকে ঘিরে একের পর এক বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এলাকাটি ভবিষ্যতে একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে—এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তেমন কোনো সন্দেহ নেই।

এক পাশে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্য পাশে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প—এই দুই মেগা প্রকল্প ইতোমধ্যে ধলঘাটাসহ আশপাশের এলাকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অংশীজনরা বলছেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চল ব্যবসা ও বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাবে পরিণত হতে পারে।

তবে উন্নয়নের এই জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ার অভিযোগও উঠছে। স্থানীয়দের একটি অংশ জানান, সরকারের জমি অধিগ্রহণের ফলে অনেক পরিবার বংশপরম্পরায় ভোগদখল করা জমি বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। শ্রমনির্ভর বহু পরিবার অভিযোগ করেন, অল্প ক্ষতিপূরণ পেয়ে তারা আগেই স্থানচ্যুত হয়েছেন। এখনও কয়েকটি পরিবার উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কেমন প্রার্থী চান—এমন প্রশ্নে ধলঘাটার বাসিন্দারা বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি ছাড়ার প্রয়োজনীয়তা তারা মোটামুটি মেনে নিয়েছেন। তবে জন্মভূমি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে তারা রাজি নন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যাতে জমি অধিগ্রহণের পরও এলাকায় থাকতে পারে, সে জন্য পরিকল্পিত একটি টাউনশিপ গড়ে তোলাই তাদের প্রধান দাবি।

ওয়ার্ড নম্বর ৩-এর সদস্য জমির উদ্দিন বলেন, সরকারের জমি অধিগ্রহণের ফলে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
“আমাদের প্রধান দাবি হচ্ছে—স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থান ও নিশ্চিত আবাসন,” বলেন তিনি।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কক্সবাজার–২ সংসদীয় আসন—যার মধ্যে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলা রয়েছে—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গোপসাগরের দ্বীপঘেরা এই আসনকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক হাব হিসেবে দেখা হয় বলেই এখানে বরাবরই হেভিওয়েট প্রার্থীদের উপস্থিতি থাকে।

২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার মোট জনসংখ্যা ৫ লাখ ২৯ হাজার ১২২ জন। ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে স্থানীয় ভোটারদের মতে, মূল লড়াই হবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুল্লাহ ফরিদ (ধানের শীষ) এবং জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আজাদ (দাঁড়িপাল্লা)—এই দুই প্রার্থীর মধ্যে।

দুই প্রার্থীই ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কুতুবদিয়ার বাসিন্দা হামিদুর রহমান আজাদ সোমবার থেকে মহেশখালীর মাতারবাড়ি এলাকায় অবস্থান করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ভোটারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি নিজের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আজাদ দুটি বহর নিয়ে ধলঘাটার নাসিরের ডেইল এলাকায় পৌঁছান। এ সময় জামায়াতের নেতাকর্মীরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে স্লোগান দেন। স্থানীয় বাজারে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তিনি। পরে সরু উপকূলীয় সড়ক ধরে আবাসিক এলাকায় ঢুকে ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সমর্থন চান।

এসময় হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, মহেশখালী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হবে।

তিনি বলেন, “মহেশখালী মাস্টারপ্ল্যান শুধু একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি নীলনকশা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মহেশখালী–কুতুবদিয়া এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।”

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে দেশের আমদানি–রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প পার্ক স্থাপন এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এই অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে।

তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয়দের চাকরি থেকে বঞ্চিত করতে একটি সুযোগসন্ধানী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। নির্বাচিত হলে অনিয়ম বন্ধ করে অগ্রাধিকার ও যোগ্যতার ভিত্তিতে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তিনি।

অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী আলমগীর ফরিদও সমানতালে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কুশল বিনিময় এবং ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চাইছেন তিনি।

আলমগীর ফরিদ বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো চালু হলে স্থানীয় মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।
“বিশেষ করে গভীর সমুদ্রবন্দর কার্যকর হলে স্থানীয় যুবকদের জন্য বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে,” বলেন তিনি।

এদিকে মহেশখালী রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক আবদুল মান্নান রানা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “মহেশখালী শুধু একটি দ্বীপ নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ কৃষি, মৎস্য, লবণ উৎপাদন ও পান চাষের ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন।”

তার দাবি, সরকারের মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই ঐতিহ্যবাহী ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনব্যবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।

রানা জানান, প্রকল্পের আওতায় ৩৪ হাজার একরের বেশি জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার একর জমি ইতোমধ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব এলাকার অধিকাংশ জমিই লবণ মাঠ, আর এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ পরিবারকে স্থানান্তর করা হয়েছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আগামী ১০ বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!