ফান্ড সংকট, পানির যুদ্ধ ও শিক্ষার বিপর্যয়: উখিয়া–টেকনাফে ‘নলেজেবল লিডারশিপ’-এর তাগিদ
কাগজে-কলমে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ বলা হলেও বাস্তবে তা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি। এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা কমে গেলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে—এটা বড় চিন্তার বিষয়।

কক্সবাজার | বে ইনসাইট
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় উখিয়া ও টেকনাফের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি সংকট, শিক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়া, পরিবেশ ধ্বংস ও স্থানীয় অর্থনীতির স্থবিরতা—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘কেমন কক্সবাজার চাই’ শিরোনামের এক নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলেন কোস্ট ফাউন্ডেশন এর সহকারী পরিচালক ও রিজিওনাল টিম লিডার জাহাঙ্গীর আলম। সংলাপটি ২৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের ডিপিএইচই হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়।
উখিয়া–টেকনাফের একজন ভোটার পরিচয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) অনুযায়ী ২০২৫ সালের জন্য রোহিঙ্গা সাড়ার বাজেট ছিল ৯৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ৪৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৪৬ শতাংশ।
তিনি বলেন, “সময় যত যাচ্ছে, ফান্ড তত ড্রাই হয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ বলা হলেও বাস্তবে তা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি। এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা কমে গেলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে—এটা বড় চিন্তার বিষয়।”

‘নলেজেবল লিডার’ না হলে সংকট বোঝা কঠিন
জাহাঙ্গীর আলমের মতে, এই জটিল বাস্তবতা মোকাবিলায় আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব।
তিনি বলেন, “স্ট্যাটিস্টিকস না বুঝলে এই সংকটগুলো বোঝা সম্ভব না। We want knowledgeable leader—এটা এখন সময়ের দাবি।”
ভূগর্ভস্থ পানির ভয়াবহ সংকট
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২২ মিলিয়ন লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, উখিয়া ও টেকনাফে প্রায় ২০ হাজার টিউবওয়েল রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এর মধ্যে ৭ হাজার টিউবওয়েল থেকে পানি ওঠে না।
তার ভাষায়, “একসময় ২০০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যেত। এখন ১ হাজার ফুট গেলেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য এখানে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।”
কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে প্রায় ৪০০ হোটেলে একাধিক ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পানি উত্তোলনেরও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। কিন্তু আমরা নিয়ম না মেনে পানি শেষ করে দিচ্ছি।”
রোহিঙ্গা ইনফ্লাক্সে ভেঙে পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা
রোহিঙ্গা আগমনের পর উখিয়া ও টেকনাফের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, “এখানে ভবিষ্যতে আর সচিব কিংবা মন্ত্রিপরিষদ সচিব তৈরি হবে—এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।”
উখিয়ায় ১১টি এবং টেকনাফে ১০টি উচ্চ বিদ্যালয় ও দাখিল মাদ্রাসা থাকলেও সেখানে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের শিক্ষক সংকট তীব্র। অনেক শিক্ষক এনজিওতে চাকরি নেওয়ায় বিদ্যালয়গুলো কার্যত শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছে ৩ হাজার ২০০-এর বেশি লার্নিং সেন্টার এবং ১০ হাজারের বেশি শিক্ষক।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এনজিওগুলো কি আমাদের ২০–২২টি স্কুল ও কলেজে প্যারা টিচার দিতে পারে না? বেতন দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে না?”
পরিবেশ ধ্বংস ও ‘এনভায়রনমেন্ট রিকভারি ফান্ড’-এর দাবি
রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের ফলে উখিয়া–টেকনাফে প্রায় ৪ হাজার একর জমি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি বলেন, “এখন আর এই জমিগুলো আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব না। তাই এনভায়রনমেন্ট রিকভারি ফান্ড গঠন করা ছাড়া বিকল্প নেই।”
তার মতে, সরকার জনপ্রতিনিধি ও এনজিওগুলোকে একসঙ্গে বসে এই তহবিল বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে।
‘২৫ শতাংশ হোস্ট কমিউনিটি বরাদ্দ’ বাস্তবে নেই
রোহিঙ্গা সহায়তায় ২৫ শতাংশ অর্থ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “এটা কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। জনপ্রতিনিধিদের উচিত এনজিওগুলোর কাছে হিসাব চাওয়া—২৫ শতাংশ কোথায় খরচ হচ্ছে?”
অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও ফাঁকা ভবন
উখিয়া ও টেকনাফে এনজিও অফিস ভাড়ার আশায় ২০০টির বেশি ভবন নির্মাণ হলেও বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন খালি পড়ে আছে বলে জানান তিনি।
“অনেকে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। আমরা একটা ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে আছি,” বলেন জাহাঙ্গীর আলম।
স্থানীয় উৎপাদন উপেক্ষিত
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ব্যবহৃত লবণ, শুঁটকি ও লুঙ্গি দেশের অন্য অঞ্চল থেকে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব পণ্য যদি কক্সবাজার থেকেই সরবরাহ করা যেত, তাহলে জেলার অর্থনৈতিক চিত্র অনেকটাই বদলে যেত।
স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নের তাগিদ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৭৮টির মতো ছোট হাসপাতাল থাকার পরিবর্তে উখিয়া হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে শয্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা একদিন চলে যাবে। কিন্তু এই অবকাঠামো আমাদেরই কাজে আসবে।”
সবশেষে তিনি বলেন, “ক্ষণস্থায়ী প্রকল্প নয়, আমাদের দরকার সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট। তা না হলে এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।”
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!