প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান: শরণার্থী কমিশনার মিজানুর রহমান
বে ইনসাইট । কক্সবাজার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত …

বে ইনসাইট । কক্সবাজার
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় বাংলাদেশ এখন তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে এবং এই সংকটের স্থায়ী সমাধান একমাত্র নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর সবচেয়ে বড় ঢলে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা আরও বেড়েছে। বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি।
তার ভাষায়, “গত দুই-আড়াই বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। অন্যদিকে প্রতিবছর ক্যাম্পগুলোতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ছে না। ফলে রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।”
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের জনগণ ও সরকারকে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। তবে তিনি উল্লেখ করেন, নয় বছর পূর্ণ হতে চললেও সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে।
প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে আরআরআরসি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম সেবা দিয়ে এখানে রাখা এবং পরে তাদের নিজ দেশে সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও আমরা প্রত্যাবাসন করতে পারিনি।”
তিনি এর জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও অনিরাপদ পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের পথে প্রধান বাধা বলে উল্লেখ করেন।
মিজানুর রহমান বলেন, “মিয়ানমারের নাগরিকরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তাদের নিজ দেশে এখনো এমন পরিবেশ তৈরি হয়নি যেখানে তারা নিরাপদে ফিরে যেতে পারবে। রাখাইনের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের অনুকূল নয়।”
তিনি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ সরকারও প্রত্যাবাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আরআরআরসি বলেন, এই মুহূর্তে সংবাদমাধ্যমে জানানোর মতো বড় কোনো অগ্রগতি নেই। তবে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রত্যাবাসন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করছে। আমরা আশা করি মিয়ানমার সরকার এবং রাখাইনে সক্রিয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে যাবে এবং প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।”
আড়াই লাখ রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাই
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যাচাই ও প্রত্যাবাসন প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মিজানুর রহমান জানান, বাংলাদেশ ২০১৭-১৮ সালেই প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গার পারিবারিক তথ্য (ফ্যামিলি ট্রি) মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল।
তিনি বলেন, “মিয়ানমার প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গার তথ্য যাচাই করেছে। তবে সেটিও অনেক আগের বিষয়। এর মধ্যে পরিবারে নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছে, কেউ মারা গেছে, অনেক পরিবার ভেঙে গেছে। ফলে যাচাই একটি চলমান প্রক্রিয়া।”
তার মতে, প্রত্যাবাসন শুরু হলে এসব তথ্য আবার হালনাগাদ করতে হবে। বর্তমানে জাতিসংঘের সহযোগিতায় পরিচালিত নিবন্ধন কার্যক্রম অনুযায়ী প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নিবন্ধিত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’
ক্যাম্পগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে আরআরআরসি বলেন, এত বড় জনসংখ্যাকে সীমিত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেক রোহিঙ্গা নিজ দেশে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে এখানে এসেছে। তাদের মধ্যে বিশেষ করে তরুণদের এক ধরনের মানসিক ট্রমা রয়েছে। তারপরও আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি।”
তিনি জানান, ক্যাম্প এলাকায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), পুলিশ, র্যাব, আনসার এবং সীমান্তে বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীরও সহযোগিতা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
স্থায়ী অবকাঠামো নয়, দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের অভিযোগ সম্পর্কে মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি একটি ভুল ধারণা।
তার ভাষায়, “রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী আবাসন তৈরির কোনো সুযোগ নেই। কিছু জায়গায় ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন করা হচ্ছে। সেখানে বাঁশের পরিবর্তে স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু এগুলো স্থায়ী নয়। নাট-বল্টু খুলে অল্প সময়ের মধ্যেই খুলে ফেলা যায়।”
তিনি জানান, পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা ক্যাম্পগুলোতে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি থাকে। ২০২৩ সালে ভূমিধস ও দুর্যোগে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছিল।
এর পর থেকে প্রতিটি ক্যাম্পে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ক্যাম্প-ইন-চার্জদের (সিআইসি) নেতৃত্বে নিয়মিত প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়।
তিনি বলেন, “যেসব এলাকা ভূমিধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোর ওপর বিশেষ নজর রাখা হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কাজটি কঠিন হলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমরা সফলভাবে এটি করতে পেরেছি। এবারও সেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।”
দীর্ঘায়িত সংকটের ভার
আরআরআরসি মিজানুর রহমান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, বাংলাদেশ এখনও মানবিক দায়িত্ব পালন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কমে আসা আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কোনোভাবেই ক্যাম্পে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নয়; বরং মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!