Site Logo
English
UNCATEGORIZEDবিশ্লেষণ

নয় বছরেও প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপ নেই, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোথায়?

২০১৮ সাল থেকে ‘আজ হবে, কাল হবে’, এমন কথা শুনে আসছেন বলে জানাচ্ছেন রোহিঙ্গা নেতারা। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

15 min read
নয় বছরেও প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপ নেই, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোথায়?

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রায় নয় বছর হয়ে গেল। এই সময়ে প্রত্যাবাসনের কথা হয়েছে বহুবার, হয়েছে তালিকা তৈরি ও যাচাই, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের আলোচনা এবং দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ।

কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরতে পারেননি।

২০১৮ সাল থেকে ‘আজ হবে, কাল হবে’, এমন কথা শুনে আসছেন বলে জানাচ্ছেন রোহিঙ্গা নেতারা। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

এখন প্রশ্ন শুধু রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে, তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন পরিস্থিতিতে, কার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে এবং কী ধরনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে তারা ফিরবে?

কারণ, গত কয়েক বছরে মিয়ানমারের পরিস্থিতি বদলে গেছে। রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের আগের সমঝোতা বাস্তবায়নের সক্ষমতা কতটা আছে, সেটিও প্রশ্নের মুখে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, পরিচয়, নিরাপত্তা, জমি-বাড়ির অধিকার এবং ফিরে গিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের নিশ্চয়তাও এখনো অনিশ্চিত।

এই বাস্তবতায় কক্সবাজারে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কতদূর’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় গবেষক, রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, প্রশাসন, জাতিসংঘ, উন্নয়নকর্মী, সিভিল সোসাইটি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যে একটি বিষয়ে বড় ধরনের মিল দেখা গেছে, প্রত্যাবাসনই মূল ও টেকসই সমাধান, কিন্তু এখনই সেই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।

আবার শুধু প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় বসিয়ে রাখারও সুযোগ নেই।

‘শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না’

ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উদ্যোগের ধরন নিয়ে।

তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন হওয়া বা না হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু ধাপ রয়েছে, কিছু কাজ করতে হয়। আর সেগুলো করতে হলে দরকার একটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান।

“শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না। ২০১৮ সাল থেকে শুনছি প্রত্যাবাসন আজ হবে, কাল হবে। কিন্তু এসব কথার কোনো প্রতিফলন দেখছি না,” বলেন তিনি।

তার মতে, এখন আর শুধু প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বললে হবে না; বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করতে হবে।

“ন্যাশনাল পলিসিতে কী চলছে, গ্লোবাল পলিসিতে কী চলছে এবং মিয়ানমার পলিসিতে কী চলছে, সেটা খেয়াল করতে হবে,” বলেন সৈয়দ উল্লাহ।

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের একক সমস্যা হিসেবেও দেখতে নারাজ তিনি। তার ভাষায়, এটি প্রথমত মিয়ানমারের, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের এবং তৃতীয়ত অন্য দেশগুলোরও সমস্যা।

পরিচয়ের প্রশ্নও প্রত্যাবাসনের কেন্দ্রে

সৈয়দ উল্লাহর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের অবস্থান।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে যে বক্তব্য দিয়ে আসছে, তার পেছনে একটি পরিকল্পিত ধারণা কাজ করছে বলে মনে করেন তিনি।

তার ব্যাখ্যা, বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার বিষয়টিকে মিয়ানমার তাদের ‘বাঙালি’ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

তার মতে, মিয়ানমার এমন একটি ধারণা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেরই মানুষ, যারা কোনো একসময় অবৈধভাবে মিয়ানমারে গিয়ে বসতি গড়েছিল এবং পরে আবার বাংলাদেশে ফিরে এসেছে।

“তারা আমাদের বাঙালি প্রমাণ করতে চায়”, বলেন সৈয়দ উল্লাহ।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের আশ্রিত জীবন ২০১৭ সালে শুরু হয়নি। ১৯৯১, ২০১৬, ২০১৭ ও ২০২৪, বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে। তাই সমস্যাটিকে শুধু সাম্প্রতিক ‘অভিবাসন’ হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক বাস্তবতা আড়ালে থেকে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি একটি সরল আবেদনও রাখেন সৈয়দ উল্লাহ।

তার বক্তব্য, বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক কোনো ‘গেমের’ অংশ হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা।

“আমরা বাংলাদেশের ওপর কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি করছি না। আমরা শুধুমাত্র শান্তি চাইছি,” বলেন তিনি।

‘আরাকানের ৯০ শতাংশ আরাকান আর্মির দখলে’

রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে প্রত্যাবাসনের আরেকটি বড় বাস্তবতা, রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ এখন কার হাতে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কোনো ছোট সংকট নয়। এটি বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক সংকট।

আরাকানের বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে হলে এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও বুঝতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

মুজিবুর রহমান বলেন, আরাকানের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলেই হবে না।

তার মতে, চীন ও ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে বাংলাদেশকে।

“এটা করতেই হবে”, বলেন তিনি।

আরাকান আর্মি কীভাবে এত বড় ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং এর পেছনে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কী ভূমিকা রয়েছে, সেটিও প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত বলে মনে করেন তিনি।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ভাষা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই রোহিঙ্গা যুবনেতা।

তার অভিযোগ, আগে রোহিঙ্গাদের ‘মুসলিম’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এখন মিয়ানমারের বক্তব্যে তাদের আরও অবমাননাকর শব্দে উল্লেখ করা হচ্ছে।

“আমরা তো ভিখারি নই। আমরা আমাদের বাপ-দাদা, চৌদ্দগুষ্টির জন্মভূমি আরাকানের মানুষ,” বলেন মুজিবুর রহমান।

তার মতে, মিয়ানমার যদি সত্যিই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাইত, তাহলে তাদের সঠিক পরিচয় স্বীকার করেই গ্রহণ করত।

একই সঙ্গে আরাকান আর্মির অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার দাবি, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের প্রতি দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় ভয়, বাংলাদেশেও যেন রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব তৈরি না হয়।

“আমরা একটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, যেটা বাংলাদেশেও ঘটছে। সেটি হলো, তারা এখানে একটি রোহিঙ্গাবিরোধী আন্দোলন বা মনোভাব তৈরি করছে,” বলেন তিনি।

‘রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি নেই’

পরিচয়ের প্রশ্নে আশ্রয় শিবিরের ক্যাম্প ইনচার্জ আরাফাতুল আলম বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আরাকানের মানুষ এবং রোহিঙ্গা পরিচয় নিয়ে তাদের কোনো বিভ্রান্তি থাকার কথা নয়।

তার বক্তব্যে উঠে আসে ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের বাস্তবতা।

ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর সামনে জন্মের সময়ই পরিবার, সমাজ ও পরিচয়ের যে স্বাভাবিক ভিত্তি থাকার কথা, তার বদলে রয়েছে সীমিত রেশন, অস্থায়ী আশ্রয় এবং রাষ্ট্রহীনতার বাস্তবতা।

আরাফাতুল আলমের মতে, রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে তারাই, যারা সেটি তৈরি করতে চায়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকার করেনি; বরং মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসেবে তাদের পরিচয় স্বীকার করেই আশ্রয় দিয়েছে।

‘আরাকান আর্মিকে বাদ দিয়ে হিসাব মিলবে না’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ড. রাহমান নাসির উদ্দিন আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনেন, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও প্রত্যাবাসনের রাজনৈতিক বাস্তবতা।

তার মতে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বহীন করে দেওয়ার প্রক্রিয়া মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ এবং এই পরিচয় অস্বীকারের রাজনীতিকে মোকাবিলা না করে প্রত্যাবাসনের আলোচনা এগোবে না।

তিনি বলেন, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার সংকুচিত করা হয়।

তবে পরিচয়ের প্রশ্নটি শুধু ইতিহাসের বিষয় নয়; মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে রোহিঙ্গারা কোন আইনি মর্যাদা পাবেন, সেটিই তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, রোহিঙ্গাদের শুধু ‘মানবিক সহায়তার গ্রহীতা’ হিসেবে দেখলে সংকটের রাজনৈতিক বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যায়।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে, তার একটি অংশকে তিনি ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা হিসেবে দেখেন।

তার বক্তব্য, বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপরাধী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য থাকতেই পারে। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডের দায় পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো উচিত নয়।

রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতাকেও প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনায় বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

তার প্রশ্ন, মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সমঝোতা রয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের সক্ষমতা এখন কতটা আছে?

“কেন্দ্রীয় সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। তাহলে চুক্তি কার সঙ্গে করলাম?”, প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের আলোচনায় মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার, আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, তিনটিকেই বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকারে তিনি আগের তুলনায় আরও তীব্র সহিংসতার তথ্য পেয়েছেন। তার ভাষায়, সেখানে “জেনোসাইড কন্টিনিউইং” হওয়ার আলামত রয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরাকান আর্মির সম্পর্কও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।

তার মতে, প্রত্যাবাসনের আগে অন্তত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি, রোহিঙ্গাদের আইনি স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদা।

“মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য এখানে এসেছি, আবার কি মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দেব?”, প্রত্যাবাসনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অর্থাৎ প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, জমি-বাড়ির অধিকার, জীবিকা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিশ্চয়তা।

‘নয় বছরেও পরিকল্পনা নেই’

ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু নয় বছর পরও কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন হবে তার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।

“এটি এখনো একটি আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই”, বলেন তিনি।

মিয়ানমারে চলমান সব ধরনের সংঘাত বন্ধ হওয়াকে প্রত্যাবাসনের প্রথম শর্ত হিসেবে দেখছেন তিনি।

এরপর প্রয়োজন হবে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজেদের এলাকায় ফিরে যাওয়ার অধিকার, জমি-বাড়ি ফিরে পাওয়ার সুযোগ এবং নাগরিকত্ব বা অন্তত নাগরিকত্বের কাছাকাছি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।

এই শর্তগুলো তৈরি করতে সময় লাগতে পারে বলেও সতর্ক করেন কলুন।

“আরও এক বছর, দুই বছর বা তিন বছর লাগতে পারে”, বলেন তিনি।

তার মতে, এসব শর্ত তৈরি করতে বাংলাদেশকে শুধু মিয়ানমারের সঙ্গে নয়, প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী পক্ষগুলোর সঙ্গেও কাজ করতে হবে।

শুধু প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকলে চলবে?

প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হতে আরও সময় লাগতে পারে, এমন বাস্তবতার মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে, সেই সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের কীভাবে রাখা হবে।

ইউএনএইচসিআরের বক্তব্যে উঠে আসে সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, নয় বছর ধরে রোহিঙ্গাদের শুধু জরুরি মানবিক সহায়তার মধ্যে আটকে রাখা যাবে না।

দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা দরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে বর্তমান সংকটের পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশ থেকে শরণার্থী এলে তা মোকাবিলার প্রস্তুতিও থাকে।

উন্নয়নকর্মী ফারিয়া হোসাইনও মনে করেন, নয় বছর কোনো ছোট সময় নয়। রোহিঙ্গা সংকট এখন আর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পর্যায়ে নেই; এটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে।

তার মতে, যাদের নিয়ে এতদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে, তাদেরকেই আলোচনার টেবিলে রাখা জরুরি। রোহিঙ্গাদের নিজেদের অনুভূতি, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ ভাবনাকে সামনে রেখে বারবার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে।

অর্থাৎ সমাধানের আলোচনা শুধু রোহিঙ্গাদের নিয়ে’ নয়, ‘রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নিয়ে’ করার প্রয়োজনীয়তার কথাই সামনে আনছেন তিনি।

‘রোহিঙ্গাদের প্রোডাক্টিভ করতে হবে’

ক্যাম্পে বসিয়ে রেখে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার বদলে তাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে আলোচনায়।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে নারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। তাদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ধরনের উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড এবং ক্যাম্পে সাবান উৎপাদনের মতো উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, সুযোগ পেলে রোহিঙ্গারা নিজেদের সক্ষমতা দেখাতে পারে।

এটি প্রত্যাবাসনের বিকল্প নয়; বরং প্রত্যাবাসন পর্যন্ত সময়টাকে কীভাবে মানবিক ও অর্থবহ করা যায়, সেই প্রশ্নের অংশ।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিনও বলেন, ক্যাম্পে বসিয়ে রেখে দীর্ঘদিন মানুষের সক্ষমতা নষ্ট করার বদলে শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করা দরকার।

রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি সার্টিফিকেশন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বিষয়েও নীতিগত সমাধান প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন: পথ, নাকি নতুন জটিলতা?

ব্র্যাকের উপদেষ্টা সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, শরণার্থী সংকটের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তিনটি সমাধান হলো, প্রত্যাবাসন, স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়া এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন।

বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়ার সুযোগ বাস্তবে নেই বলে মনে করেন তিনি। ফলে প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের পথও খোলা রাখা প্রয়োজন।

তার মতে, সংখ্যা সীমিত হলেও একটি পরিবারের স্থায়ীভাবে অন্য দেশে জায়গা পাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। তাই এই উদ্যোগ আবার সক্রিয় করার পক্ষে তিনি।

তবে তার বক্তব্যেও পরিষ্কার, মূল সমাধান প্রত্যাবাসনই।

এজন্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট নীতি, কূটনৈতিক রোডম্যাপ এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর সম্পৃক্ততা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তবে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন নিয়ে ভিন্ন উদ্বেগের কথাও জানান ক্যাম্প ইনচার্জ আরাফাতুল আলম।

তার মতে, এই সুযোগ রোহিঙ্গাদের মধ্যে একটি নতুন মানসিকতা তৈরি করছে—বাংলাদেশ থেকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো দেশে যাওয়াকেই কেউ কেউ ভবিষ্যতের পথ হিসেবে দেখছেন।

ক্যাম্পে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, পুনর্বাসনের জন্য ‘ভালনারেবিলিটি’ একটি মানদণ্ড হওয়ায় অনেকেই নিজেদের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। এতে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং যারা যেতে পারছেন না, তাদের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।

তার বক্তব্য, এতে প্রত্যাবাসনের আকাঙ্ক্ষা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

“প্রত্যাবাসন হচ্ছে একমাত্র সলিউশন”, এমন অবস্থানই তুলে ধরেন তিনি।

বাংলাদেশের নীতিও প্রত্যাবাসনকেন্দ্রিক: ক্যাম্প ইনচার্জ

আরাফাতুল আলমের বক্তব্যে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট করার চেষ্টা দেখা যায়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়ার নীতি নেয়নি।

অস্থায়ী আশ্রয়, মিয়ানমারভিত্তিক শিক্ষা এবং রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ, এসবকেই প্রত্যাবাসনকেন্দ্রিক নীতির অংশ হিসেবে দেখেন তিনি।

রোহিঙ্গা সেন্টারসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে তাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

একই সঙ্গে হোস্ট কমিউনিটির জীবিকা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকার কথা বলেন তিনি।

‘মর্যাদার সঙ্গে ফেরাতে হবে’

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা নিয়ে আরও একটি কঠিন প্রশ্ন তোলেন।

তার বক্তব্যের সারকথা, ১২ লাখের বেশি মানুষকে যদি ধাপে ধাপে ফেরত পাঠাতে হয়, তাহলে কাজটি কত দীর্ঘ হতে পারে তা সহজেই বোঝা যায়।

কিন্তু তার কাছে শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই প্রত্যাবাসন নয়। ‘ডিগনিটি উইথ ডিগনিটি, অর্থাৎ মর্যাদার সঙ্গে ফেরার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে বিপুল আন্তর্জাতিক সহায়তা এলেও পরে আফগানিস্তান ও ইউক্রেনসহ অন্য সংকট সামনে আসায় আন্তর্জাতিক মনোযোগ অনেকটাই সরে গেছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া এই বিপুল মানবিক সংকট পরিচালনা করাও বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন বলে স্বীকার করেন তিনি।

তাই তাঁর বক্তব্যে দুটি বিষয় পাশাপাশি, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা।

দীর্ঘ নয় বছরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর ওপর চাপ বাড়তে পারে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।

রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ জায়গা ও মর্যাদার কথা যেমন ভাবতে হবে, তেমনি যে স্থানীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটের প্রভাব বহন করছে, তাদের মর্যাদা ও স্বার্থের কথাও বিবেচনায় নিতে হবে বলে বক্তারা মনে করেন।

‘রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যেও ঐক্য দরকার’

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও ২০১৭ সালের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আসার কারণে সমস্যাগুলো বড় হয়েছে।

তার মতে, রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যেও বিভাজন রয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন ও গোষ্ঠীর বিরোধ এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ সংঘাত আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গাদের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে।

আলোচনায় সাংবাদিক ও স্থানীয় প্রতিনিধিরাও ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন।

হেলাল উদ্দিন রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরি এবং তাদের বক্তব্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন।

একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।

প্রশাসনের প্রশ্ন: ‘সমাধানটা কীভাবে হবে?’

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া এমন একটি ফোরামের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যেখানে গবেষক, রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় পক্ষগুলো একসঙ্গে কথা বলতে পারে।

তার বক্তব্যে উঠে আসে, এ ধরনের আলোচনা থেকে যদি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের জন্য সুস্পষ্ট সুপারিশ তৈরি করা যায়, তাহলে সেটি সরকারের কাজে লাগতে পারে।

অর্থাৎ গোলটেবিলের আলোচনাকে শুধু মতবিনিময়ে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি নীতিগত সুপারিশ বা পলিসি ব্রিফে রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।

এতে প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের মানুষের অভিজ্ঞতাকে একই নীতির মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ছাড়া সমাধান কঠিন

আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তাদের অনেকেই মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়।

আঞ্চলিক শক্তি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, আসিয়ান, চীন ও ভারতের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

ব্র্যাকের সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু দুই দেশের কূটনীতি যথেষ্ট হবে না; বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

সিভিল সোসাইটির আলোচনায় চীন ও ভারতের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নও এসেছে।

তাহলে সামনে কী?

গোলটেবিলের বিভিন্ন বক্তব্য মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের সামনে কয়েকটি সমান্তরাল পথ দেখা যাচ্ছে।

প্রথমত, প্রত্যাবাসনকে মূল লক্ষ্য রেখে মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো।

দ্বিতীয়ত, শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার নয়, আসিয়ানসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকে আরও সক্রিয় করা।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতি ও কাঠামো তৈরি করা।

চতুর্থত, প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানো।

পঞ্চমত, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সীমিত সুযোগ আবার সক্রিয় করার চেষ্টা করা।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রোহিঙ্গাদের নিজেদের বক্তব্যকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জায়গা দেওয়া।

কারণ নয় বছর ধরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের টেবিলে তারা কতটা ছিল, সেই প্রশ্নটিই এখন সামনে আনছেন উন্নয়নকর্মী ফারিয়া হোসাইনসহ আলোচনায় অংশ নেওয়া অনেকেই।

নয় বছর পর প্রশ্নটি বদলে গেছে

২০১৭ সালে প্রশ্ন ছিল, কীভাবে রোহিঙ্গাদের বাঁচানো যাবে।

কিছুদিন পর প্রশ্ন হলো, তাদের কীভাবে ফেরত পাঠানো যাবে।

এখন নয় বছর পর প্রশ্নটি আরও কঠিন:

ফেরার মতো নিরাপদ মিয়ানমার কবে তৈরি হবে?

আর সেই সময় আসতে যদি আরও এক, দুই বা তিন বছর লাগে, তাহলে বাংলাদেশ কীভাবে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থের মধ্যে রেখে পরিচালনা করবে?

আলোচনার বক্তাদের বক্তব্যে তিনটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এক, রোহিঙ্গারা ফিরতে চায়।

ক্যাম্প ইনচার্জ আরাফাতুল আলমের বক্তব্যেও সেটি স্পষ্ট। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রায় সবাই নিজেদের ঠিকানায় ফিরতে চায়।

দুই, বাংলাদেশও প্রত্যাবাসনকেই মূল সমাধান হিসেবে দেখছে।

তিন, কিন্তু যে মিয়ানমারে তাদের ফেরার কথা, সেই মিয়ানমারের রাখাইনে এখন বাস্তব নিয়ন্ত্রণের সমীকরণই বদলে গেছে।

সৈয়দ উল্লাহ তাই বলছেন, শুধু প্রত্যাবাসনের কথা না বলে স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা দরকার।

মুজিবুর রহমান বলছেন, চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিকে সম্পৃক্ত না করলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন।

আর ক্যাম্প ইনচার্জ বলছেন, বাংলাদেশের নীতি শুরু থেকেই প্রত্যাবাসনকেন্দ্রিক, কিন্তু এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিনের প্রশ্ন আরও মৌলিক, যে ভূখণ্ডে রোহিঙ্গাদের ফেরানো হবে, সেই ভূখণ্ডের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা কী?

‘ফেরার মতো মিয়ানমার কোথায়?’

সব বক্তব্য একসঙ্গে রাখলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সামনে এখন মূলত তিনটি বড় বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে।

রোহিঙ্গারা ফিরতে চায়।

বাংলাদেশ তাদের ফেরত পাঠাতে চায়।

কিন্তু মিয়ানমারের যে অংশে তাদের ফেরার কথা, সেখানে সংঘাত চলছে এবং নিয়ন্ত্রণের পুরোনো সমীকরণ বদলে গেছে।

ফলে প্রত্যাবাসন এখন আর শুধু সীমান্তের দুই পাশে দুই সরকারের মধ্যে একটি চুক্তির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, জমি-বাড়ির অধিকার, জীবিকা, শিক্ষা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি।

এ কারণেই গোলটেবিলের আলোচনায় বক্তাদের মধ্যে একটি বিষয়ে বড় ধরনের ঐকমত্য দেখা গেছে, প্রত্যাবাসনই শেষ পর্যন্ত সমাধান, কিন্তু এখনই তা বাস্তবায়নের মতো পরিবেশ নেই।

তাই প্রত্যাবাসনকে বাস্তব করতে হলে শুধু নতুন করে তালিকা তৈরি বা বৈঠক করলেই হবে না।

প্রয়োজন মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা বুঝে একটি কৌশলগত রোডম্যাপ, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক চাপ।

একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি নীতিও প্রয়োজন।

কারণ, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হতে আরও কয়েক বছর লেগে গেলে শুধু ত্রাণ দিয়ে সেই সময় পার করা সম্ভব নয়।

প্রশ্নটি তাই এখন আর শুধু ‘রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে’ নয়।

প্রশ্নটি হলো, ফেরার মতো মিয়ানমার কবে তৈরি হবে, আর সেই সময় না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশ কী নীতি নিয়ে এই সংকট সামলাবে?

গোলটেবিলের আলোচনায় পাওয়া উত্তরগুলো বলছে, শুধু প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না।

প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনীতি যেমন দরকার, তেমনি প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় নীতিও দরকার।

আর সেই নীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে তিন পক্ষের স্বার্থ, রোহিঙ্গা, বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার।

‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কতদূর’ শীর্ষক গোলটেবিলটি বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজন করে স্থানীয় গণমাধ্যম বে ইনসাইট ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এমবোলডেন বাংলাদেশ। আলোচনাটি পরিচালনা করেন বে ইনসাইট সম্পাদক সৌরভ দেব; সভাপতিত্ব করেন বে ইনসাইট মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক ও এমবোলডেন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হাসনা হুরাইন এবং প্রারম্ভিক বক্তব্য দেন এমবোলডেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ইনজামাম উল হক।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!