Site Logo
English
বিশ্লেষণ

তিন রাষ্ট্রপর্বে কক্সবাজারের তিন মন্ত্রী: উপকূল থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে

ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ—তিন রাষ্ট্রপর্বেই এই জেলা থেকে মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব ছিল।

4 min read
তিন রাষ্ট্রপর্বে কক্সবাজারের তিন মন্ত্রী: উপকূল থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

পর্যটন নির্ভর জেলা হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসে মন্ত্রিত্বের নজির খুব বেশি নয়। তবে ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ—তিন রাষ্ট্রপর্বেই এই জেলা থেকে মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব ছিল। জন্ম, পরিবার, ছাত্ররাজনীতি, দলীয় উত্থান, মন্ত্রীত্ব এবং বিতর্ক—সব মিলিয়ে তিনজনের রাজনৈতিক জীবন তিন ভিন্ন সময়ের প্রতিচ্ছবি।


ব্রিটিশ ভারত পর্ব

হারবাংয়ের সন্তান, প্রাদেশিক স্বাস্থ্য মন্ত্রী

১৮৯০ সালে কক্সবাজারের হারবাংয়ে জন্ম নেন জালালউদ্দিন আহমদ। শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পান। বাংলা, আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা তাঁকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলে। সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে “খান বাহাদুর” উপাধি দেয়।

১৯৩৭ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বঙ্গীয় আইনসভায় প্রবেশ করেন। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী–এর মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৪৬–৪৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জনস্বাস্থ্য সংকট ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সময়কালেই ছিল তাঁর মন্ত্রীত্ব।
ব্রিটিশ ভারতের শেষ অধ্যায়ে কক্সবাজার থেকে এটিই ছিল প্রথম প্রাদেশিক মন্ত্রীত্ব।


পাকিস্তান পর্ব

রামুর ফরিদ আহমদ: ছাত্রনেতা থেকে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী

৩ জানুয়ারি ১৯২৩ সালে রামুর রশিদ নগরে জন্ম নেন ফরিদ আহমদ। ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারে বেড়ে ওঠা ফরিদ আহমদ উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৫২ সালে তিনি নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪–১৯৬৯ পর্যন্ত নেজামে ইসলাম পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের চিফ হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৭ সালে প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল ইব্রাহিম চুন্দ্রিগারের মন্ত্রিসভায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৫ পর্যন্ত পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৫ সালে বক্সার মুহাম্মদ আলিকে নিয়ে Muhammad Ali Clay শিরোনামে বই লেখেন। মাসিক ‘পৃথিবী’ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক এবং দৈনিক ‘নাজাত’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন।

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের আহ্বানে অনুষ্ঠিত রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। একই বছরে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন। ১৯৭১ সালে দামেস্কে আফ্রো-এশীয় পিপলস সলিডারিটি অর্গানাইজেশনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ ঢাকায় ইস্ট পাকিস্তান সেন্ট্রাল পিস কমিটি গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। ইস্ট পাকিস্তান পিস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি ও রাজাকার বাহিনীর উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এই অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বিতর্কিত করে তোলে।


স্বাধীন বাংলাদেশ পর্ব

সালাহউদ্দিন আহমদ: প্রতিমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৩০ জুন ১৯৬২ সালে চকরিয়ায় জন্ম নেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পিতা শায়দুল হক, মাতা আয়েশা হক। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে তৃতীয় খালেদা জিয়া সরকারের সময়ে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হন।

দলীয় কাঠামোয় তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে দলীয় মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভীর গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়া তাঁকে দলের মুখপাত্র নিয়োগ দেন।

নিখোঁজ ও কারাবাস

২০১৫ সালের মার্চে ঢাকার উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন তিনি। বিএনপির দাবি ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁকে আটক করেছে; প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী র‌্যাবের সদস্যরা তাঁকে তুলে নেয়। দুই মাস পর ভারতের শিলংয়ে তাঁর অবস্থান জানা যায়। ভারতীয় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে বিদেশি আইন ভঙ্গের অভিযোগ আনে। ৩ জুন ২০১৫ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় নর্থ ইস্টার্ন ইন্দিরা গান্ধী রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল সায়েন্সেসে রাখা হয়।

তিন বছরের বেশি সময় পর, ২০১৮ সালের অক্টোবরে মেঘালয়ের আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। ভারতে অবস্থানকালেই বিএনপি তাঁকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ শিলংয়ের আপিল আদালত তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়।

বর্তমান দায়িত্ব

রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন—যা কক্সবাজার থেকে উঠে আসা রাজনীতিকদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্বের পদ।


তিন সময়, তিন বাস্তবতা

রাষ্ট্রপর্বনামজন্মস্থানদলমন্ত্রীত্ব
ব্রিটিশ ভারতজালালউদ্দিন আহমদহারবাংকৃষক প্রজা পার্টিস্বাস্থ্য মন্ত্রী
পাকিস্তানফরিদ আহমদরামুনেজামে ইসলাম পার্টিকেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী
বাংলাদেশসালাহউদ্দ্দিন আহমদচকরিয়াবিএনপিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী; বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার থেকে উঠে আসা এই তিন রাজনীতিক তিন ভিন্ন রাষ্ট্রপর্বে তিন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করেন—ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ অধ্যায়, পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের দলভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি।

সংখ্যায় কম হলেও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের উপস্থিতি তাই স্পষ্ট—সমুদ্রের তীর থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে আমরা সহযোগিতা নিয়েছি-

  1.  ্কালাম আজাদ (২০১৪). মুক্তিসংগ্রামে কক্সবাজার : প্রসঙ্গ রাজনীতি : কক্সবাজার জেলা প্রশাসন পৃ. ১২৭–১২৮.
  2.  Government of Bengal. “Alphabetical list of members”. Bengal Legislative Assembly Proceedings (1939). Vol. 54. 
  3.  Indian Annual Register, Volume 1. Annual Register Office. 1944. p. 2.
  4. হাসান মুরাদ সিদ্দীকী: চকরিয়ার ইতিহাস

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!