Site Logo
English
কক্সবাজার

টেকনাফ স্থলবন্দর চালুঃ বাস্তবতা ও নিরাপত্তা কতোটুকু?

তবে মন্ত্রীর এই ঘোষণার পরও বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি এতটা সরল নয়।

3 min read
টেকনাফ স্থলবন্দর চালুঃ বাস্তবতা ও নিরাপত্তা কতোটুকু?

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর টেকনাফ স্থলবন্দর পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। তবে সরকারি এই সিদ্ধান্তের পরও নিরাপত্তা, নৌপথ ও বাস্তব বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়ে গেছে নানা সংশয় ও ভিন্নমত।

সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে টেকনাফ স্থলবন্দর পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আজ থেকে বন্দরের কার্যক্রম পুনরায় সচল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

তিনি জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কার্যক্রম চালানো হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা ঠেকাতে কড়াকড়ি আরোপের কথাও জানান তিনি।

নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভিন্ন চিত্র

তবে মন্ত্রীর এই ঘোষণার পরও বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি এতটা সরল নয়।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক আবেদ আহসান সাগর বে ইনসাইটকে বলেন, “আমাদের মনে হয়েছে বন্দরের কার্যক্রম চালু না হওয়ার পেছনে মূল ফ্যাক্টর ছিল নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আপত্তি, বিশেষ করে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের অবস্থান ছিল নেগেটিভ।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে, বন্দর ব্যবহার করে চোরাচালান বৃদ্ধি, বিশেষ কিছু পণ্যের (যেমন সিমেন্ট ও রড) সম্ভাব্য অপব্যবহার, এবং সীমান্ত পরিস্থিতির ঝুঁকি।

এছাড়া বন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা পোস্ট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে ব্যবসায়ীরা এর বিরোধিতা করেছেন, কারণ বন্দরের নিজস্ব আইনগত কাঠামো রয়েছে।

স্ক্যানার বসানোর প্রস্তাব

বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আসে পণ্য তদারকির জন্য স্ক্যানার স্থাপন নিয়ে।

সাগর বলেন, “মন্ত্রী বলেছেন বন্দরে স্ক্যানার বসানো হবে। এতে পণ্য ওঠানামার সময় স্ক্যানের মাধ্যমে যাচাই করা যাবে। বিজিবি চাইলে গেট বা চেকপোস্টে তল্লাশি করতে পারবে।”

‘চালু’ ঘোষণা, কিন্তু পণ্য আসেনি

টেকনাফ স্থলবন্দরের মহাব্যবস্থাপক জসীম উদ্দিন জানান, বাস্তবে এখনও বাণিজ্য শুরু হয়নি।

তিনি বলেন, “বন্দর তো খোলা ছিলই। এখনো আমরা প্রস্তুত আছি। মালপত্র আসলে কার্যক্রম শুরু হবে, তারপরই বোঝা যাবে পরিস্থিতি।”

আরাকান আর্মি ও নৌপথের জটিলতা

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে আরাকান আর্মি নাফ নদীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে পণ্যবাহী ট্রলার আটকে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু বন্দর চালুর ঘোষণা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

আবেদ আহসান সাগর বলেন, “বর্তমান নৌপথে চলাচল করতে গিয়ে অনেক সময় মিয়ানমারের জলসীমা ব্যবহার করতে হয়। এই কারণে বিভিন্ন গ্রুপকে টাকা দিতে হচ্ছে। নাফ নদের নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় ড্রেজিং করা গেলে বিকল্প পথ তৈরি হবে, তখন এই ঝুঁকি কমবে।”

তার মতে, ড্রেজিং না হলে কিছুদিন পর আবারও বন্দর অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আটকে

ব্যবসায়ীদের দাবি, মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিপুল অর্থ আটকে আছে।

সাগর বলেন, “প্রায় ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ড্রাফট আকারে আটকে আছে। পণ্য আসতে পারলেই এই অর্থ সমন্বয় করা সম্ভব হবে।”

ব্যবসায়ীদের আশাবাদ, তবে শর্তসাপেক্ষ

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বন্দর চালুর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, “এটা ব্যবসায়ীদের জন্য অবশ্যই ভালো। পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ নিত্যপণ্য কম খরচে আসতে পারবে। রাজস্বও বাড়বে।”

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, “আমরা আরাকান আর্মিকে বুঝি না, আমরা বুঝি ওপারের ব্যবসায়ীদের। তারা কীভাবে মাল পাঠাবে, সেটা তাদের দায়িত্ব।”

নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান

এদিকে টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মুহাম্মদ হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, “মন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা সেটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছি। নিরাপত্তা বিষয়টি আলোচনা হয়েছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

বন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা কাঠামো জোরদারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর ২৭ একর জমির ওপর টেকনাফ স্থলবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।

তবে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল একটি কাঠবোঝাই ট্রলার আসার পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় আমদানি কার্যক্রম।

সরকারি ঘোষণায় বন্দর চালুর পথ খুললেও, বাস্তবে বাণিজ্য কতটা দ্রুত স্বাভাবিক হবে—তা নির্ভর করছে সীমান্ত নিরাপত্তা, নৌপথের সক্ষমতা এবং মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!