Site Logo
English
ইনসাইট স্টোরিকক্সবাজার

জাইকা’কে ‘খুশি’ করতেই সৈকতের বালিয়াড়িতে চার লেনের সড়ক!

“সিভিল ইঞ্জিনিয়ার পরিচয়ে একজন ডিপ্লোমা ইন আর্কিটেকচার অ্যান্ড ড্রাফটসম্যানশিপকে প্রকল্পটির নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। জাইকার সঙ্গে মতের অমিলের কারণে প্রকল্প থেকে দুজনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”

12 min read
জাইকা’কে ‘খুশি’ করতেই সৈকতের বালিয়াড়িতে চার লেনের সড়ক!

। সৌরভ দেব ।

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতকে রক্ষার জন্য যে বালিয়াড়িকে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই বালিয়াড়ির ওপর দিয়েই তৈরি হচ্ছে চার লেনের সড়ক ও ‘শহর রক্ষা বাঁধ’।

শুরুতে প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বিকল্প নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

তাঁদের দাবি, প্রকল্পের নকশা তৈরির সময় বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের একটি অংশ বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণে রাজি ছিলেন না। পরে যে নকশায় নির্মাণ হচ্ছে, তাতে সৈকতের ওপর দিয়েই চার লেনের সড়ক রাখা হয়।

তারা প্রশ্ন তুলছেন সড়কটির ভবিষ্যৎ নিয়েও।

স্থপতি ও ইকোলজিস্ট সুমাইয়া মামুন সেঁজুতি, যিনি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কক্সবাজার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তিনি বলেন, “চার লেনের সড়ক, ক্রসিং, সিঁড়ি ও র‌্যাম্প পেরিয়ে পর্যটককে সৈকতে নামতে হলে কক্সবাজারের স্বাভাবিক সৈকত-অভিজ্ঞতাই বদলে যাবে।”

পরিস্থিতিটিকে তিনি ‘মিস্টার বিন’স হলিডে সিনেমার একটি দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে ব্যস্ত সড়ক ও যানবাহনের মধ্য দিয়ে পথ করে একজনকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা যায়।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলছেন, কক্সবাজারের সৈকত দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের মধ্যে রয়েছে। লাবণী, কলাতলী থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত সৈকতের অনেক অংশ ক্ষয়ে গেছে। ফলে ভাঙন ঠেকাতে কোনো প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে সেই নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত বালিয়াড়ি পুনর্গঠনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

এদিকে এর মধ্যেই এগিয়ে চলছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার এই প্রকল্প।

কক্সবাজার পৌরসভা এটির বাস্তবায়ন করছে, অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা—জাইকা। সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার অংশে ২৮ মিটার প্রশস্ত চার লেনের সড়ক, রিটেইনিং ওয়াল, সিঁড়ি, র‌্যাম্প, পার্কিং ও ওয়াশ সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে এতে।

কিন্তু যে জায়গায় কাজ হচ্ছে, সেটি প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ। আর পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য, এই প্রকল্পের জন্য কোনো পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।

এই প্রতিবেদনে আমরা দেখার চেষ্টা করেছি, সড়কটি কেন করা হচ্ছে, এর নকশা কী, বিকল্প ছিল কি না, বালিয়াড়ির পরিবেশগত গুরুত্ব কতটা, শহর রক্ষার যুক্তিটি কতটা যৌক্তিক, পরিবেশ ছাড়পত্রের অবস্থান কী এবং প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষ আসলে কী বলছে।

যে জায়গায় এখন মাটি ফেলা হচ্ছে

সুগন্ধা সৈকত থেকে দক্ষিণ দিকে গিয়ে দেখা গেছে, সমুদ্রের একেবারে কাছাকাছি বালিয়াড়ির ওপর মাটির কাজ চলছে।

সড়কের পশ্চিম পাশে কোনো কোনো জায়গায় সমুদ্র মাত্র ৪০ থেকে ৫০ ফুট দূরে। বালিয়াড়ির ওপর ছড়িয়ে থাকা সাগরলতার কিছু অংশ মাটির নিচে চাপা পড়েছে, কিছু জায়গায় যন্ত্রের আঘাতে সেগুলো উপড়ে গেছে।

স্থানীয় এক শ্রমিকের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ শুরুর সময় থেকে প্রায় সাত-আট দিন ধরে মাটির কাজ চলছিল।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের (এনডিই) প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহীন মিয়ার বক্তব্য, নিয়মনীতি মেনেই কাজ চলছে এবং পরিবেশ ছাড়পত্রের বিষয়টি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানে।

নকশার শুরুতেই ছিল সৈকতের ওপর সড়ক

সুমাইয়া মামুন সেঁজুতির বক্তব্য অনুযায়ী, সড়কটির নকশা ২০২৩ সালে করা হয়।

তিনি বলেন, প্রথমদিকে কয়েকজন বাংলাদেশি প্রকৌশলী বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে এইভাবে সড়ক নির্মাণে রাজি হচ্ছিলেন না। একজন প্রকৌশলী এমন একটি নকশার প্রস্তাব দেন যেখানে প্রাকৃতিক ঢাল রাখার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের টিম লিডারের পক্ষ থেকে উঁচু ফুটপাত, সিঁড়ি ও অন্যান্য কাঠামোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

সুমাইয়ার দাবি, এ নিয়ে নকশা তৈরিতে প্রায় দেড় বছর সময় লাগে। একাধিক প্রকৌশলী পরিবর্তনের পর শেষ পর্যন্ত যে নকশা তৈরি হয়, সেটিই এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে।

তাঁর ভাষ্য, জাইকা ও টিম লিডারের চাপেই এই পরিবর্তন হয়।

তিনি জানান, একজন ব্যক্তিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার পরিচয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তিনি আসলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নন, তার যোগ্যতা ছিল ডিপ্লোমা ইন আর্কিটেকচার অ্যান্ড ড্রাফটসম্যানশিপ। এমনকি তার সিভিও খুঁজে বের করে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যক্তিকেই প্রকল্পটির নকশা (ডিজাইন) তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

‘জাইকার কথা না শোনায়’ দুজনকে সরানো হয়েছিল

প্রকল্পটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর দাবি করেছেন এই স্থপতি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক গোলাম মোস্তফা তাঁকে জানিয়েছিলেন, জাইকার সঙ্গে মতের অমিলের কারণে প্রকল্প থেকে দুজনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তবে এই দাবির পক্ষে কোনো সরকারি নথি তাঁর হাতে নেই বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, সরকারি নথিতে প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে ‘ম্যানমাস কেটে দেওয়া’ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার মতো বিষয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত কারণ কী ছিল, সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই জানেন।

এ বিষয়ে তাঁর নিজের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, প্রকল্প থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছেন, এমন অভিযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু তাঁর দাবি, প্রকল্পে থাকা অবস্থাতেই তাঁরা একাধিকবার সতর্ক করেছিলেন যে এভাবে কাজ করা ঠিক হবে না।

চার লেন কেন এবং বিকল্প রাস্তা কি ছিল?

সুমাইয়া সেঁজুতির প্রশ্নের একটি বড় অংশ সড়কের প্রস্থ নিয়ে।

তাঁর বক্তব্য, এই এলাইনমেন্টে চার লেনের সড়ক নেওয়া উচিত ছিল না। কারণ সড়কটি শুধু একটি সরু উপকূলীয় রাস্তা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ফুটপাত, সিঁড়ি, র‌্যাম্প, পার্কিং এবং অন্যান্য অবকাঠামো।

অন্যদিকে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, সড়কটি প্রায় ৮১-৮২ ফুট বা ২৮ মিটার প্রশস্ত হবে। সুগন্ধা পয়েন্টে একটি সার্কেল থাকবে, বিভিন্ন জায়গায় সৈকতে নামার জন্য সিঁড়ি ও র‌্যাম্প থাকবে। কলাতলী অংশে রাউন্ডঅ্যাবাউট বা মোড়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সড়কের এক পাশে পার্কিং ও ওয়াশ সুবিধা রাখার কথাও প্রকৌশলী জানিয়েছেন।

এখানে সুমাইয়ার প্রশ্নটি শুধু পরিবেশগত নয়, পর্যটন পরিকল্পনা নিয়েও।

আর বিকল্প রাস্তা ছিল কিনা- এই প্রশ্নটি প্রকল্পের বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

সুমাইয়া সেঁজুতির দাবি, কলাতলীর পেছনে আগে থেকেই একটি রাস্তা রয়েছে, যেটি প্রশস্ত করা যেত।

তাঁর হিসাব অনুযায়ী, সৈকতের দিকে রিটেইনিং ওয়ালসহ নতুন সড়ক নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় হবে, তার তুলনায় পেছনের রাস্তা সম্প্রসারণে ব্যয় অনেক কম হতে পারত। তিনি এমন একটি প্রস্তাব প্রকল্পের টিম লিডারের কাছে দেওয়ার কথাও বলেছেন। কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি।

তবে পৌরসভার বক্তব্যে বিষয়টি ভিন্নভাবে আসে।

সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়ার ভাষ্য, বর্তমান এলাইনমেন্টটি সরকারি খাস জায়গা ধরে নেওয়া হয়েছে; কিছু অংশে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সঙ্গে বিষয়টি জড়িত হতে পারে। সড়ক নির্মাণের পথে থাকা অবৈধ দখল উচ্ছেদের কথাও তিনি বলেছেন।

শুধু ১.২ কিলোমিটার রাস্তা নয়, বড় পরিকল্পনার অংশ?

সুমাইয়া সেঁজুতির দাবি, সুগন্ধা-কলাতলী অংশটি বিচ্ছিন্ন কোনো সড়ক নয়, এটি একটি বড় উপকূলীয় সড়ক নেটওয়ার্কের অংশ।

তিনি বলেন, বড় পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বা সংস্থার আওতায় রয়েছে, কোথাও এলজিইডি, কোথাও রেলওয়ে, কোথাও সড়ক ও জনপথ, কোথাও অন্য প্রকল্পের অংশ রয়েছে। বর্তমান প্রকল্প সেই বড় পরিকল্পনার একটি অংশ হিসেবে এগোচ্ছে।

পৌর প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়াও বলেছেন, ভবিষ্যতে এই সড়ক কক্সবাজারের বৃহত্তর মেরিন রোডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সুগন্ধা-কলাতলী অংশটি পরবর্তীতে লাবণী, কবিতা চত্বর, নাজিরারটেক হয়ে বিমানবন্দরমুখী মেরিন রোড নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাহলে প্রশ্নটি শুধু বর্তমান ১ দশমিক ২ কিলোমিটার নিয়ে থাকে না।

এই সড়ক যদি বৃহত্তর মেরিন রোডের একটি অংশ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতের সঙ্গে অবকাঠামোর সম্পর্ক কী হবে?

‘শহর রক্ষা বাঁধ’—কাকে রক্ষা করবে?

প্রকল্পের নামের একটি অংশ হলো ‘শহর রক্ষা বাঁধ’।

পৌরসভার যুক্তি, কক্সবাজারের সৈকত দীর্ঘদিন ধরে ভাঙছে এবং সেই ভাঙন ক্রমে শহরের দিকে এগিয়ে আসছে। তাই সড়কটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে এটি একই সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।

রুমেল বড়ুয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের কবিতা চত্বর, নাজিরারটেক, শুঁটকিপল্লী, লাবণী ও সুগন্ধা এলাকায় জোয়ারের পানিতে সৈকত ক্রমশ বিলীন হচ্ছে। তাঁর মতে, সড়কটি হলে শহরকে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা করার একটি বড় প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।

এই যুক্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার করছেন না সমুদ্রবিজ্ঞানী আহমেদ বেলাল হায়দার পারভেজ।

বরং তাঁর বক্তব্য, গত প্রায় ৩০ বছর ধরে কক্সবাজারের সৈকতে ভাঙন দেখা যাচ্ছে এবং সেটি অব্যাহত রয়েছে। লাবণী পয়েন্টের আগের অবস্থান তিনি নিজের জীবদ্দশায় দেখেছেন, হিমছড়ি ও বাট্টু মিয়ার খামারসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সৈকত হারিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন।

তাঁর মতে, ভাঙন ঠেকাতে কোনো ব্যবস্থা না নিলে একসময় ভাঙন আরও ভেতরে অগ্রসর হতে পারে।

তাই ভাঙন প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে যদি প্রকল্পটি করা হয়ে থাকে, সেটির প্রয়োজনীয়তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কিন্তু এখানেই তিনি একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, নির্মাণের সময় ক্ষতিগ্রস্ত বালিয়াড়ি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁর মতে, অল্প খরচে যত্ন নিলেই বালিয়াড়ি পুনর্গঠন করা সম্ভব।

স্থপতি সুমাইয়া সেঁজুতি অবশ্য ‘শহর রক্ষা বাঁধ’ নামটি নিয়েই আপত্তি তুলেছেন।

তাঁর বক্তব্য, কক্সবাজার শহর সমুদ্রের পানি ঢুকে ডুবে যাচ্ছে, এমন পরিস্থিতি নেই। শহরের জলাবদ্ধতার বড় একটি কারণ পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত সমুদ্রে নামতে না পারা।

তাই সমুদ্রের পাশে বাঁধ দিয়ে ‘শহর রক্ষা’ করার যুক্তিটি তাঁর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।

তাঁর ভাষায়, “যদি ডুবে যেয়ে থাকে সেটা হচ্ছে পাহাড়ি ঢল এসে পানি নামতে পারতেছে না, সাগর থেকে পানি তো যেয়ে শহরে ঢুকতেছে না। তাহলে কাকে বাঁধ দিচ্ছে?”

এটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে সবচেয়ে সরাসরি প্রশ্নগুলোর একটি।

বালিয়াড়ি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এখানে দুই বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে।

সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলছেন, বালিয়াড়ি বা স্যান্ড ডিউন বালুকাময় সৈকতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। বালিয়াড়ি না থাকলে বালুকাময় সৈকতের স্বাভাবিক চরিত্রই থাকে না।

এখানে একটি স্বতন্ত্র বাস্তুতন্ত্র থাকে। সমুদ্রের কাছিম, লাল কাঁকড়া, বিভিন্ন ক্রাস্টাসিয়ান ও পাখির আবাস ও প্রজননের জায়গা হিসেবে বালিয়াড়ি কাজ করে। পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট লতা, গুল্ম ও উদ্ভিদ কেবল এই ধরনের পরিবেশেই জন্মায় এবং সেগুলো বালিয়াড়ি গঠন ও ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে।

তিনি আরও বলেছেন, কক্সবাজারের দীর্ঘ সৈকতজুড়ে বালিয়াড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাগরলতা, কেয়া, নিসিন্দাসহ উপকূলীয় উদ্ভিদের অনেকটাই এখন আর আগের মতো নেই। তাঁর পর্যবেক্ষণে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ধরনের উদ্ভিদের একটি তালিকা করা হয়েছিল, যেগুলো বালিয়াড়ি গঠন ও ধরে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ বালিয়াড়ি এখানে শুধু ‘বালুর টিলা’ নয়; এটি একটি জীবন্ত উপকূলীয় ব্যবস্থা।

এই কথার বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে নির্মাণস্থলেও।

সাগরলতা মাটির নিচে চাপা পড়ছে। কোথাও খননযন্ত্র দিয়ে বালু সমান করতে গিয়ে উদ্ভিদ উপড়ে যাচ্ছে।

সুমাইয়া সেঁজুতির মতে, কক্সবাজারের সৈকতের প্রাকৃতিক উদ্ভিদব্যবস্থা ইতোমধ্যেই অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরিবেশবিদ এই স্থপতি নোনাঝাউয়ের উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে একসময় নোনাঝাউ ছিল; কিন্তু তা এখন প্রায় নেই। বর্তমানে সৈকতে যে ঝাউয়ের বড় অংশ দেখা যায়, তার অনেকটাই বিদেশি প্রজাতির অস্ট্রেলিয়ান ঝাউ। নোনাঝাউয়ের শিকড় গভীরে গিয়ে মাটি ধরে রাখে, যেখানে অন্য প্রজাতির গাছের শিকড়ের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।

সৈকত কি ছড়া থেকে আসা পলিতে তৈরি হয়?

সুমাইয়া সেঁজুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, কক্সবাজারের সৈকত গঠনের ক্ষেত্রে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি ও পলির স্বাভাবিক প্রবাহও বিবেচনায় নিতে হবে।

তাঁর মতে, সৈকত বাড়তে হলে পানি ও পলির স্বাভাবিক চলাচল প্রয়োজন। উপকূলের সঙ্গে সমান্তরালে সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে যদি বিভিন্ন ছড়া বা পানিপ্রবাহের মুখ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে একদিকে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে এবং অন্যদিকে সমুদ্রের চাপ বাড়তে পারে।

তিনি সমিতিপাড়ার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে পূর্ব-পশ্চিমমুখী সড়ক ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো থাকায় বসতি বাড়লেও সৈকত সামনের দিকে এগিয়েছে, এমন পরিবর্তন তিনি দেখেছেন।

অন্যদিকে ভুল পরিকল্পনার কারণে সাবরাংয়ের ভাঙনের উদাহরণও তিনি দিয়েছেন। তাঁর মতে, সেখানকার একটি পুরনো খালের বরাবর ভাঙন হয়েছে।

সমুদ্র বিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেছেন, কক্সবাজারের সৈকতের পলি গঠনের মূল প্রক্রিয়াটি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা ডেল্টা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। স্রোত ও পলির দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় পলি এসে সৈকতে জমা হয়।

আগের রাস্তা কি টেকেনি?

সুমাইয়া সেঁজুতি বলছেন, এই ধরনের নির্মাণ কক্সবাজারে নতুন নয়।

তাঁর দাবি, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এর আগে যে ধরনের রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটির কিছু অংশ টেকেনি; মডার্ন হ্যাচারির সামনে এখনো তার কিছু চিহ্ন দেখা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

এই কারণে তাঁর আশঙ্কা, নতুন সড়কও যদি সমুদ্রের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, তাহলে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তাঁর যুক্তি, এই অর্থ শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, পরামর্শক ব্যয়, ঋণের সুদসহ ভবিষ্যতে আরও অর্থনৈতিক দায় তৈরি হতে পারে।

তাঁর ভাষায়, সড়ক টেকসই না হলে “ঋণের টাকাটা” শেষ পর্যন্ত জনগণের কাজে আসবে না।

তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট পৌর প্রকৌশলী এই আশঙ্কা স্বীকার করেননি। তাঁর বক্তব্য, সমুদ্রের কাছাকাছি অন্যান্য জায়গাতেও রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে এবং প্রকল্পটি এমন উচ্চতায় নকশা করা হচ্ছে যাতে সর্বোচ্চ জোয়ারের পানির স্তর বিবেচনায় থাকে।

কলাতলী সৈকতে রিটেইনিং ওয়াল বসানো হলে ফল কী হবে?

সুমাইয়া সেঁজুতির আশঙ্কা, রিটেইনিং ওয়াল বসানোর জন্য বালু-পলি খুঁড়ে সরাতে হবে। এমনিতেই যেখানে সৈকত ক্ষয় হচ্ছে, সেখানে পলি সরিয়ে স্থায়ী কাঠামো বসালে সৈকত আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অন্যদিকে সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর এর মতে, ভাঙন যদি চলতেই থাকে এবং কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে সেটি একসময় আরও ভেতরে যেতে পারে। তাই প্রতিরোধের ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।

বাতিল প্লট কি বিকল্প হতে পারত?

কক্সবাজার সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মশিয়ুর রহমান জানিয়েছেন, সৈকতসংলগ্ন বেশ কিছু বন্দোবস্ত বাতিল হয়েছে। যেসব জায়গায় বড় স্থাপনা তৈরি হয়ে গেছে, সেগুলো উচ্ছেদের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন রয়েছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ ব্যয়ে হোটেল তৈরি হওয়ায় সরকার ক্ষতিপূরণ দিতে না পারায় পুরনো স্থাপনা এখনো রয়ে গেছে। তবে নতুন করে স্থাপনা তৈরি হলে উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেছেন, বাতিল হওয়া জায়গাগুলো খাস জমির আওতায় রয়েছে।

এখানেই বাপার বক্তব্যের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত হয়।

বাপা কক্সবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং ২০১৩ সালের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী সৈকতসংলগ্ন ৩০০ মিটার এলাকাকে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তাই বালিয়াড়ি ভরাট করে রাস্তা না করে সরকারি বাতিল প্লট ব্যবহার করে বিকল্প সড়ক করার সুযোগ রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি—বেলাও এই প্রকল্প নিয়ে আইনি নোটিশ দিয়েছে।

তবে পৌরসভার প্রকৌশলীর বক্তব্যে প্রকল্পের বর্তমান এলাইনমেন্ট সরকারি খাস জায়গা এবং বিদ্যমান রাস্তার ধার ধরে নেওয়ার কথা এসেছে। কোথাও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি পড়লে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

পরিবেশ ছাড়পত্র কোথায়?

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেছেন, ইসিএভুক্ত সমুদ্রসৈকত এলাকায় বড় ধরনের সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক।

কিন্তু সুগন্ধা থেকে কলাতলী পর্যন্ত এই প্রকল্পের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন।

এ কারণে প্রকল্প পরিচালক ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে এবং প্রকল্পের নথি তিন কার্যদিবসের মধ্যে উপস্থাপনের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সময়মতো জবাব না পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক।

কিন্তু পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়ার বক্তব্য একেবারেই ভিন্ন।

তিনি দাবি করেছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই কাজ শুরু হয়েছে। তাঁর যুক্তি, প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত; জরিপ, নকশা, গবেষণা ও পরিবেশগত প্রক্রিয়া ছাড়া এমন প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার কথা নয়।

এই প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা স্থপতি সুমাইয়া সেঁজুতি জানান, বাংলাদেশি টিম শুরুতে যে ডিজাইনটি দিয়েছিল, সেটি নিয়েই মূলত ঘটনাটি। কারণ পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে যে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল, সেখানে পূর্বের ৯ মিটার সড়কটিই বিবেচনায় ছিল। ওই ৯ মিটার সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্যই পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল।

ঠিকাদারের বক্তব্য কী?

প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের (এনডিই) প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহীন মিয়ার বক্তব্য, নিয়মনীতি মেনেই কাজ হচ্ছে। পরিবেশ ছাড়পত্রের বিষয়টি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানে।

অর্থাৎ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি পরিবেশ আইন ভঙ্গের অভিযোগ স্বীকার করছে না।

এদিকে পৌর প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপের প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার কাজ ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর সায়মন বিচ রিসোর্ট থেকে দক্ষিণে বেলি হ্যাচারি পর্যন্ত আরও প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার অংশে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপেও শতকোটি টাকার মতো ব্যয় হতে পারে।

অর্থাৎ বর্তমান কাজটি শেষ হলে প্রকল্পটি থেমে যাওয়ার কথা নয়; আরও দক্ষিণে এর সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

বিশ্বের উদাহরণ ও বালিয়াড়ি পুনর্গঠন

সুমাইয়া সেঁজুতি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কথাও তুলেছেন।

তাঁর বক্তব্য, জাপান, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে সমুদ্রতীর রক্ষায় অবকাঠামো নির্মাণের পর সৈকত ধরে রাখতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। কোথাও ‘বিচ নারিশমেন্ট’ করে বাইরে থেকে বালু এনে সৈকত পুনর্গঠন করতে হয়।

তিনি শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, সেখানে সমুদ্রের কতটা কাছে অবকাঠামো করা যাবে, তার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে। কক্সবাজারের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সময়ও অন্যান্য দেশের সৈকত ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করা হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন।

সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর এর বক্তব্যে একটি সম্ভাব্য বিকল্পের কথাও রয়েছে।

তাঁর মতে, বালিয়াড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেগুলো পুনর্গঠন করা সম্ভব। অন্য অনেক দেশে বালিয়াড়ির ওপর মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়, কারণ সামান্য আঘাতেও এই বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের দীর্ঘ সৈকতে পরিকল্পিতভাবে উপকূলীয় উদ্ভিদ ফিরিয়ে এনে বালিয়াড়ি গঠন ও সংরক্ষণ করা সম্ভব।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!