গর্জন বন নেই, এখন বালু উত্তোলনের দখলে বনভূমি
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এভাবে বালু উত্তোলন চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বক্তব্যেও উঠে এসেছে দায়িত্ব নিয়ে এক ধরনের জটিলতা।

বে ইনসাইট রিপোর্ট
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা বাজার থেকে আঁকাবাঁকা গ্রামীণ সড়ক ধরে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গেলে পাগলীর বিল সড়ক। সড়কের দুই পাশে সরকারি নথিতে এখনও বনভূমি। তবে বাস্তবে কোথাও বসতি, কোথাও দখল, আর কোথাও শুধুই ঝোপঝাড়।
একসময় এই এলাকায় ছিল বিশাল গর্জন গাছের ঘন বন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনায়, বনের ভেতরে ঢুকতেও মানুষ ভয় পেতেন। এখন সেই বনের চিহ্ন বলতে অল্প কিছু ঝোপঝাড় আর পাঁচ-ছয় ফুটের বেশি উঁচু নয় এমন কিছু আকাশমণি গাছ।
বন ধ্বংসের পর এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে বালু উত্তোলন। বনভূমির ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া পাগলীছড়া, স্থানীয়ভাবে হরগজা ছড়া নামেও পরিচিত, থেকে যন্ত্র দিয়ে প্রকাশ্যে বালু ও মাটি তোলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এভাবে বালু উত্তোলন চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বক্তব্যেও উঠে এসেছে দায়িত্ব নিয়ে এক ধরনের জটিলতা।
যে বনে ছিল গর্জনের আধিপত্য
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদেরের বয়স এখন অনেক। তাঁর স্মৃতিতে পাগলীর বিলের বন এখনও গর্জন গাছের বন।
তিনি বলেন, ২০০৫ সালের পর স্থানীয় একটি চক্র বড় বড় গর্জন গাছ কেটে বন ধ্বংস করতে শুরু করে। পরে ২০১২ সালের পর এলাকায় সামাজিক বনায়ন শুরু করে বন বিভাগ। কিন্তু সেই বনায়নের গাছও একসময় কেটে ফেলা হয়।
“পাগলীর বিল সড়ক থেকে হরগজা পর্যন্ত দুই পাশে এখন পাঁচ-ছয় ফুটের বেশি বড় গাছ নেই,” বলেন আবদুল কাদের।
সামাজিক বনায়নের আওতায় তাঁরও প্রায় দুই একর জমি রয়েছে। কিন্তু এখন আর নতুন করে গাছ লাগাতে আগ্রহী নন তিনি।
কারণ, তাঁর ভাষায়, “গাছ একটু বড় হলেই কেটে নিয়ে যায়।”
বন ধ্বংসের পাশাপাশি প্রায় দুই দশক ধরে এই এলাকায় বালু উত্তোলনও চলছে বলে জানান তিনি। তাঁর আশঙ্কা, মাটির নিচ থেকে এভাবে বালু তোলা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।
দিনে ৩০ থেকে ৪০ ট্রাক, সামনে আরও বাড়ার আশঙ্কা
স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিনের হিসাবে, বর্তমানে যন্ত্র দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ট্রাক মাটি ও বালু তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আর এক মাস পর বালু তোলার মৌসুম শুরু হবে। তখন প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালু তোলা হবে এবং চট্টগ্রামে পাঠানো হবে।”
সম্প্রতি সরেজমিনে পাগলীছড়ার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে দেখা যায়, ছড়া ও জলধারার বিভিন্ন অংশ থেকে যন্ত্রের সাহায্যে বালু উত্তোলনের চিহ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন ছড়ার আরও গভীরে গিয়ে বালু তোলা হচ্ছে।
দায়িত্ব কার?
বালু উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে সরকারি সংস্থাগুলোর বক্তব্যে পাওয়া গেছে ভিন্নতা।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক কামরুল হাসান বলেন, যেখান থেকে বালু তোলা হচ্ছে, সেটি তাঁদের আওতাধীন নয়। তাঁর দাবি, এলাকাটি লামা বন বিভাগের অধীনে।
অন্যদিকে লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হরগজার যে এলাকায় বালু তোলা হচ্ছে, সেটি তাঁদের আওতাধীন।
তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে সংরক্ষিত বন নেই।
“সংরক্ষিত বন না হওয়ায় সেখানে বালু তোলা হলেও বন বিভাগের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই,” বলেন তিনি।
লামার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন বলেন, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বালু তোলার বিষয়টি তাঁর জানা আছে।
তাঁর ভাষ্য, উপজেলা সদর থেকে এলাকাটি দূরে হওয়ায় অভিযান পরিচালনা করতে কর্মকর্তারা সেখানে পৌঁছানোর আগেই খবর পেয়ে বালু উত্তোলনকারীরা সরে যান।
তিনি বলেন, কোনো এলাকায় বালু উত্তোলন হলে পরিবেশ অধিদপ্তরকে মামলা করতে হয়। এরপর জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এমন উদ্যোগ না থাকায় তাঁদেরও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত।
পরিবেশ অধিদপ্তরও বলছে ভিন্ন কথা
বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নূর হোসেন সজীবের বক্তব্য আবার কিছুটা ভিন্ন।
তিনি বলেন, নতুন মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা আইনে এ ক্ষেত্রে তাঁদের মামলা করার এখতিয়ার নেই।
“পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। কিন্তু বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের এখতিয়ার রয়েছে,” বলেন তিনি।
ফলে স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে, বছরের পর বছর ধরে বালু উত্তোলন চললেও এর দায় নেবে কোন সংস্থা?
কারা বালু তুলছে?
বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের পরিচয় জানতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যে রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের স্থানীয় কিছু নেতা বালু উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।
স্থানীয়ভাবে মোহাম্মদ জামাল, জামাল (ওরফে তেল জামাল), ভুট্টো, আবুল হোসেনসহ কয়েকজনের নাম এসেছে। তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদ জামাল ডুলহাজারা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভুট্টও একই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তেল জামাল ও আবুল হোসেন যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
বিএনপি নেতা মোহাম্মদ জামাল বন বিভাগের করা একটি মামলার আসামি বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে জামাল বালু উত্তোলনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি শুধু বালু কিনে চট্টগ্রামে সরবরাহ করেন।
মোহাম্মদ জামাল বলেন, হারগাজায় যুবলীগের সভাপতি আব্দুল হাকিমের নেতৃত্বে বালু তোলা হতো, কিন্তু পরে বিএনপির ছেলেরা গিয়ে সেটা তুলে দেয়। তাই তাঁর নাম দেয়া হচ্ছে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে।
গর্জন বন ধ্বংসের পুরোনো গল্প
পাগলীর বিলের বন কীভাবে ধ্বংস হলো, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে স্থানীয়দের মুখে বারবার এসেছে ইউনুস ওরফে ইনু ডাকাতের নাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ওই বনাঞ্চলে তাঁর প্রভাব ছিল এবং বন থেকে গাছ কেটে কাঠ বিক্রির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে পুলিশ জানিয়েছিল, দুই দল ডাকাতের বন্দুকযুদ্ধে ইনু নিহত হয়েছেন। তবে তাঁর পরিবারের দাবি ছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে একটি কালো মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর গুলিবিদ্ধ মরদেহ ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
স্থানীয়দের কেউ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ বিশ্বাস করেননি। তবে গাছ কাটা ও কাঠ বিক্রির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
ইনুর ভাগনে পরিচয় দেওয়া জিহাদের দাবি, “আমার চাচা কোনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বন থেকে গাছ পরিষ্কার করার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণেই তাঁকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়।”
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ফিরতে পারে কি গর্জনের বন?
দুলাহাজারা বিটের বন কর্মকর্তা শাহরিয়ার আমিন বলেন, পাগলীর বিল সড়কের দুই পাশের বন অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
“এক পাশে দুলাহাজারা বিট, অন্য পাশে খুটাখালী বিট। পাগলীর বিল সড়কের দুই পাশে এখন বড় গাছ নেই,” বলেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, সামাজিক বনায়নের আওতায় তৈরি একটি বাগানও সম্প্রতি কেটে ফেলা হয়েছে। এখন ওই এলাকায় আবার বনায়ন প্রয়োজন।
শাহরিয়ার আমিনের মতে, পরিকল্পিতভাবে নতুন করে বনায়ন করা গেলে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে গর্জনের বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তাঁর হিসাবে, এই অঞ্চলে প্রায় তিন থেকে চার হাজার একরজুড়ে বনভূমি রয়েছে।
তিনি জানান, তাঁর বিটের বনাঞ্চল থেকেও সম্প্রতি বালু উত্তোলন করা হয়েছিল। বন বিভাগ মামলা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পর সেই উত্তোলন বন্ধ হয়েছে।
বন গেছে, এবার কি যাবে মাটিও?
সরেজমিনে দেখা গেছে, বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ছড়া ও পাহাড়ি জলধারার বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে মাটি ও বালু উত্তোলনের চিহ্ন রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ কেটে বন উজাড় করার পর এখন ছড়া, নদী ও মাটির নিচের বালুও তুলে নেওয়া হচ্ছে।
একসময় যে বন ছিল বড় বড় গর্জন গাছে ঘেরা, সেখানে এখন বন ফিরিয়ে আনার কথা বলছে বন বিভাগ। কিন্তু সেই বনভূমির ভেতরেই যদি বালু উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে নতুন করে গাছ লাগালেই কি আগের বন ফিরবে?
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বন রক্ষা এবং বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এর পরিবেশগত ক্ষতি শুধু গাছ হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দীর্ঘমেয়াদে বদলে যেতে পারে মাটি, জলধারা এবং পুরো এলাকার প্রতিবেশব্যবস্থাও।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!