“গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা সংকট জাতীয় এজেন্ডায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি” : রাহমান নাসির উদ্দিন
সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের মধ্যে হলেও প্রকৃত সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি হতে পারে।

বে ইনসাইট । কক্সবাজার
আগামী ২৫ আগস্ট পূর্ণ হবে রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ বড় ঢলের নয় বছর। প্রায় এক দশক পার হলেও প্রত্যাবাসনের কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন অনুপ্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে যাওয়ার কারণে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস উপলক্ষে বে ইনসাইটের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেন, সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের মধ্যে হলেও প্রকৃত সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি হতে পারে।
রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “২০১৭ সালে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ছিল। এরপর গত নয় বছরে জন্মহার বিবেচনায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার করে জনসংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে অনুপ্রবেশও হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশে ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে বলে আমি মনে করি।”
প্রত্যাবাসন ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ অবস্থায়
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি “স্ট্যান্ডস্টিল” শব্দটি ব্যবহার করেন।
তার ভাষায়, “এটা এমন এক অবস্থা, যেখানে কোনো অগ্রগতিও নেই, আবার আনুষ্ঠানিকভাবে পিছিয়েও যায়নি। সামনে এগোচ্ছে না, পেছাচ্ছেও না।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের বড় ঢল নামার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি করে। এরপর টাস্কফোর্স গঠন, শারীরিক ব্যবস্থাপনা চুক্তিসহ দ্রুত নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৮ সালের নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের আগস্টে প্রত্যাবাসনের দুটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
“এর প্রধান কারণ ছিল মিয়ানমারের অনীহা এবং আন্তরিকতার অভাব। রোহিঙ্গারা জানতে চেয়েছিল তারা কোথায় থাকবে, নিরাপত্তা কে দেবে, তাদের ফেলে আসা সম্পদ ফেরত পাবে কি না। এসব প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর মিয়ানমার দিতে পারেনি,” বলেন তিনি।
কোভিড, অভ্যুত্থান ও যুদ্ধের ধাক্কা
রাহমান নাসির উদ্দিনের মতে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার পেছনে পরবর্তী ঘটনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, “কোভিড-১৯ মহামারির পর পুরো বিষয়টি ধীর হয়ে যায়। এরপর ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তার বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ফলে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যায়।”
তার মতে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে নতুন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
“গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা সংকট জাতীয় এজেন্ডায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি,” বলেন তিনি।
হতাশ তরুণ প্রজন্ম
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই গবেষক বলেন, সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছে ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম।
“যে শিশুর বয়স ২০১৭ সালে ১০ বছর ছিল, তার বয়স এখন ১৯। যে কিশোরের বয়স ছিল ১৫, সে এখন ২৪ বছরের যুবক। তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা কেটে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার মধ্যে,” বলেন তিনি।
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা অনেককে বিপজ্জনক সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা কিংবা নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
“তারা খুবই হতাশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে,” যোগ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ কমছে
রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অগ্রাধিকার তালিকায় আগের মতো নেই।
“ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাসহ নানা বৈশ্বিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেছে। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যু ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে,” বলেন তিনি।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকেই দায়ী করতে চান না তিনি।
তার মতে, “বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যথেষ্ট কার্যকরভাবে বোঝাতে পারেনি যে এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।”
নতুন বাস্তবতায় নতুন নীতি প্রয়োজন
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই একমাত্র টেকসই সমাধান বলে মনে করেন রাহমান নাসির উদ্দিন। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তা দ্রুত সম্ভব নয় বলেও তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, “ধরুন কাল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সিদ্ধান্ত নিল রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাবে। তবুও বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ এখন মিয়ানমার কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে নেই।”
তার মতে, শুধু প্রত্যাবাসনের কথা বললে হবে না; পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের প্রস্তাব
সমাধানের অংশ হিসেবে তিনি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেন।
“যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করে আরও বেশি রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনের সুযোগ খুঁজতে হবে,” বলেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করারও পরামর্শ দেন।
তার ভাষায়, “১৫ লাখ মানুষকে শুধু সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে হবে না। তাদের এমন কাজে যুক্ত করতে হবে, যাতে তারা বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হয়।”
ভাসানচরে পশুপালন, হস্তশিল্প ও অন্যান্য জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে রোহিঙ্গাদের দক্ষতা ও শ্রমকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
‘প্যাকেজ ডিল’ ভাবনার প্রস্তাব
রাহমান নাসির উদ্দিন আরও বলেন, যেহেতু সংকট দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা নেই, তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা বা “প্যাকেজ ডিল” নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
“বাংলাদেশ যদি আরও কয়েক বছর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও অন্যভাবে এর দায় ভাগ করে নিতে হবে। সেটা হতে পারে বাণিজ্য সুবিধা, শিক্ষা বৃত্তি, শ্রমবাজারে সুযোগ বৃদ্ধি বা অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে,” বলেন তিনি।
তার মতে, প্রায় এক দশক ধরে চলমান এই সংকট মোকাবিলায় পুরোনো অবস্থানের পাশাপাশি নতুন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণের সময় এসেছে।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!