কক্সবাজারের স্থানীয়দের জন্য নেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো, ৮ বছরে রোহিঙ্গা চিকিৎসা নিয়েছে আড়াই লাখ
“মানসিক সমস্যা হলে কোথায় যাবো, সেটা আমরা জানিই না।”

বে ইনসাইট | কক্সবাজার
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে বে ইনসাইট কাজ করতে গিয়ে- কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং এবং ৪৩ হাজারের বেশি রোগী মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। এটি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সংস্থা এমএসএফ এর তথ্য। যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করেন।
স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি এবং দীর্ঘদিন শিবিরজীবনের মানসিক চাপের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কিন্তু এই অগ্রগতির বিপরীতে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারিভাবে কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, যা উদ্বেগজনক বাস্তবতা হিসেবে উঠে এসেছে।

বছরের শুরুতেই সেবার চাহিদা স্পষ্ট
চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এই দুই মাসেই শরণার্থী শিবিরে ৭,৬১৬ জন ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং গ্রহণ করেছেন ও ৩,৫৯৩ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েছেন।
সেবাটি রোহিঙ্গা ও স্থানীয় উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত থাকলেও, সিংহভাগ রোগীই রোহিঙ্গা।
একজন মাঠপর্যায়ের কাউন্সেলর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,
“প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। অনেকেই প্রথমে শারীরিক সমস্যা মনে করে আসে, পরে বোঝা যায় বিষয়টা মানসিক।”
ট্রমার দীর্ঘ ছায়া
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সহিংসতা ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ এখনও সেই ট্রমার ভার বহন করছে। শিবিরের অনিশ্চিত জীবন, কর্মসংস্থানের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা, সব মিলিয়ে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
কুতুপালং শিবিরের বাসিন্দা (ছদ্মনাম) রহিমা বেগম বলেন,
“রাতে ঘুম হয় না। পুরনো কথা মনে পড়ে। বাচ্চাদের নিয়ে সবসময় ভয় লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয় মাথা ঠিক থাকে না।”
স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, এমন অভিজ্ঞতা এখন ব্যতিক্রম নয়, বরং ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যে মানসিক সমস্যাগুলো
চিকিৎসকদের মতে, শিবিরে প্রধান সমস্যা হলো: বিষণ্নতা (Depression), উদ্বেগজনিত ব্যাধি (Anxiety disorder), সাইকোসিস (Psychosis), বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার (Bipolar Mood disorder)।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, কার্যকর চিকিৎসার জন্য শুধু ওষুধ নয়, নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মনোসামাজিক সহায়তাও প্রয়োজন।
এমএসএফ-এর সমন্বিত চিকিৎসা মডেল
এমএসএফ-এর ডেপুটি কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (মেডিকেল) ডা. আশিষ কুমার দাশ বলেন,“কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ওষুধ ও কাঠামোবদ্ধ কাউন্সেলিং, এই দুইয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। আমরা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিটগুলোতে এই দুই ধরনের চিকিৎসাই একসাথে প্রদান করি।”
এমএসএফ ইউনিটগুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং কাউন্সেলর কাজ করছেন, যা রোগীদের প্রমাণভিত্তিক ও সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করছে।
স্থানীয়দের জন্য সেবা সীমিত
কিন্তু কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো এখনও সীমিত। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মং টিন ঞ বলেন, “বর্তমানে হাসপাতালে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই এবং আলাদা মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগও চালু হয়নি।
তিনি বলেন, খুব শিগগিরই আমরা একটি আলাদা বিভাগ চালুর পরিকল্পনা করছি। যেখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সেলর থাকবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন,
“মানসিক সমস্যা হলে কোথায় যাবো, সেটা আমরা জানিই না। সরকারি হাসপাতালে এই সেবা থাকলে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হতো।”
সামনে কী চ্যালেঞ্জ
রোহিঙ্গা শিবিরে সেবার অগ্রগতি ইতিবাচক হলেও, অনেক মানুষ এখনও চিকিৎসার বাইরে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সেবা না থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে কক্সবাজারের এই চিত্র একটি বিষয় স্পষ্ট করে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখন মানবিক সহায়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!