কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে ছড়িয়ে পড়ে চীনা-তাইওয়ানিজ নাগরিকদের অনেকে
অভিযুক্ত চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকদের অনেকে ভিসা অন অ্যারাইভাল নিয়ে গত ১ মার্চ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তারা বাংলাদেশে নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার কথা বলে রিসোর্ট ভাড়া নিয়েছিল। তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে ওই নামে কোনো নির্মাণ কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।
কক্সবাজারে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকদের একটি বড় দলের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার তাঁদের আদালতে তোলা হলে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ছয়জনই ওই দলের পুরো সদস্য নন। মামলার এজাহারে অজ্ঞাতনামা হিসেবে আরও ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকের কথা বলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকে ২৬ আগস্ট রামুর হিমছড়ির একটি রিসোর্টে পুলিশের অভিযানের পর কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে ছড়িয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এখন তাঁদের শনাক্ত ও আটকের জন্য অভিযান চলছে।
পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, অভিযুক্ত চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকদের অনেকে ভিসা অন অ্যারাইভাল নিয়ে গত ১ মার্চ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
তাঁরা এপ্রিল মাস থেকে কয়েকটি রিসোর্ট ভাড়া নেওয়া শুরু করেছিলেন বলে গোয়েন্দা অনুসন্ধানের বরাতে এজাহারে বলা হয়েছে।
রামু থানার ওসি এ কে ফজলুল হক বে ইনসাইটকে বলেন, পুরো দলের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদের আটকের চেষ্টা চলছে।
তাঁর ভাষ্য, পুলিশের অভিযান সম্পর্কে আঁচ করতে পেরে দলের অন্য সদস্যরা বিচ্ছিন্নভাবে পালিয়ে যান এবং কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নেন।
“পুরো গ্যাংয়ের মধ্যে মাত্র ছয়জন আটক হয়েছে। অন্যান্যদের আটকে অভিযান চলছে। অভিযানের পর অন্যরা বিচ্ছিন্নভাবে পালিয়ে আছে। তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নেয়,” বলেন ওসি।
কক্সবাজার শহরের অন্তত তিনটি হোটেলে সাম্প্রতিক সময়ে চীনা নাগরিকদের দলবদ্ধভাবে অবস্থানের তথ্য পেয়েছে বে ইনসাইট।
—
তিন হোটেলে অবস্থানের তথ্য
—
সুগন্ধা এলাকার হোটেল রয়েল পার্ল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত এক মাসে সেখানে প্রায় ২০ জন চীনা নাগরিক অবস্থান করেছেন।
তাঁদের মধ্যে সাতজনের একটি দল ২৭ আগস্ট হোটেলটিতে ওঠে এবং ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অর্থাৎ, ২৬ আগস্ট রামুর হিমছড়িতে পুলিশের অভিযানের পরদিনই চীনা নাগরিকদের একটি দল কক্সবাজার শহরের এই হোটেলে অবস্থান নেয়।
সুগন্ধার কাছের আরেক হোটেল স্যান্ড সিটি কর্তৃপক্ষও একই ধরনের একটি দলের কথা জানিয়েছে।
হোটেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট প্রায় ২০ জনের একটি দল সেখানে আসে। তারা একদিন অবস্থান করে এবং পরে আরও থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু আগে থেকেই বুকিং থাকায় তাদের আর রাখা সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজারের হোটেল সি-প্যালেস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২৬ আগস্ট সেখানে চীনা নাগরিকদের একটি দল ওঠে। ওই দলের ছয়জনকে বৃহস্পতিবার রাতে আটক করে পুলিশ।
ফলে পুলিশের ভাষ্যের সঙ্গে হোটেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা গেলে, আগস্টের শেষ সপ্তাহে কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে চীনা নাগরিকদের একাধিক দলের চলাচল ছিল।
তবে এসব হোটেলে অবস্থানকারী প্রত্যেক ব্যক্তি একই অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
—
কোথা থেকে শুরু হয় অভিযান
—
পুলিশ জানিয়েছে, কক্সবাজারের রামুর হিমছড়ি এবং উখিয়ার ইনানী-মেরিন ড্রাইভ এলাকায় কয়েকটি রিসোর্ট ও আবাসিক স্থাপনায় ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মতো চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিক অবস্থান করছিলেন।
তাঁদের মধ্যে কয়েকজন দীর্ঘ সময় ধরে রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে নিজেদের মতো করে সেগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করছিলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা অনুসন্ধানের বরাতে পুলিশ বলেছে, হিমছড়ির মেরীনা বিচ ভিলা রিসোর্টের একটি বড় হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব এবং একটি সাউন্ডপ্রুফ রুম তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বিপুলসংখ্যক আইফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছিল।
২৬ আগস্ট ওই রিসোর্টে অভিযান চালায় পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি দল।
পুলিশ বলছে, অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সেখানে থাকা চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকদের কয়েকজন রিসোর্টের পেছনের খোলা সৈকত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যান।
অভিযানের সময় রিসোর্টের একটি অবরুদ্ধ হলরুম থেকে ১ হজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫১টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস, ২৪টি কানেকশন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়া চীনা পুলিশের র্যাংক ব্যাজ, পুলিশ লোগোযুক্ত টাই এবং চীনের জাতীয় পতাকাও পাওয়ার কথা এজাহারে বলা হয়েছে।
—
ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের অভিযোগ
—
পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে এই দলটির বিরুদ্ধে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকদের এই চক্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, ভুয়া প্রোফাইল এবং ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের লোগো ব্যবহার করে প্রতারণা চালাতে পারে।
তবে একই নথিতে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কীভাবে, কাদের সঙ্গে এবং কত পরিমাণ অর্থের প্রতারণা করা হয়েছে, এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, বিদেশি নাগরিকদের একটি অংশ বাংলাদেশে নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার কথা বলে রিসোর্ট ভাড়া নিয়েছিল। তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে ওই নামে কোনো নির্মাণ কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
—
ছয়জনের বাইরে চারজন পলাতক
—
মামলায় গ্রেপ্তার ছয়জনের পাশাপাশি আরও চারজনকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁরা হলেন ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, উ ঝিপিং, জিয়ান ঝাং তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
—
অভিযানের পর কোথায় গেলেন তাঁরা?
—
এই মামলায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, ২৬ আগস্টের অভিযানের পর রিসোর্ট থেকে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা কোথায় গেলেন?
রামু থানার ওসি এ কে ফজুল হকের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের একটি অংশ কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নিয়েছে।
বে ইনসাইটের পাওয়া তথ্যও অন্তত তিনটি হোটেলে চীনা নাগরিকদের অবস্থানের বিষয়টি জানা গেছে।
হোটেল রয়েল পার্লে ২৭ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতজনের একটি দলের অবস্থান, স্যান্ড সিটিতে ২৫ আগস্ট প্রায় ২০ জনের একটি দলের আসা এবং সি-প্যালেসে ২৬ আগস্ট একটি দলের ওঠার তথ্য পাওয়া গেছে।
এর আগে ২৬ আগস্ট অভিযানের পর রিসোর্টে পাওয়া সরঞ্জামের বিষয়টি নিয়ে চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!