কক্সবাজারের ‘নামি’ স্কুলগুলো কোথায়?
কক্সবাজার শহরের বাইরে চকরিয়া, মহেশখালী ও পেকুয়া-সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় সেরাদের তালিকায় একের পর এক জায়গা করে নিয়েছেন।

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।
চট্টগ্রাম বিভাগের এসএসসি ফলাফলে কক্সবাজারের শিক্ষার্থীদের সাফল্য উজ্জ্বল। কিন্তু সেই সাফল্যের মানচিত্রে বড় একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে, জেলা শহরের কথিত ‘ভালো’ স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা কোথায়?
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে স্বস্ব বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের শীর্ষ ১০০ মেধাক্রমের মোট ৩০০ শিক্ষার্থীর তালিকায় কক্সবাজারের ২২ জন জায়গা করে নিয়েছেন। বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক, তিন বিভাগেই রয়েছে কক্সবাজারের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি।
কিন্তু এই ২২ জনের মধ্যে জেলা শহরের কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মাত্র দুইজন।
তিনি কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাবিহা নওরিন। বিজ্ঞান বিভাগে ১ হাজার ৩০০ নম্বরের মধ্যে ১ হাজার ২৫১ পেয়ে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৯তম হয়েছেন।
অন্যজন মানবিক বিভাগ থেকে বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমির ছাত্রী সায়মা রুহানা রুমি। তিনি এই বিষয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে ৬৩ তম স্থান পেয়েছেন।
অন্যদিকে, কক্সবাজার শহরের বাইরে চকরিয়া, মহেশখালী ও পেকুয়া-সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় সেরাদের তালিকায় একের পর এক জায়গা করে নিয়েছেন।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে, যেসব স্কুলকে বছরের পর বছর কক্সবাজারের ‘নামকরা’ বা ‘প্রথম সারির’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাদের শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় মেধার তালিকায় কেন এতটা অনুপস্থিত?
তিন বিভাগে তিনটি চিত্র
বিজ্ঞান বিভাগে কক্সবাজারের সেরা হয়েছেন চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী মুনতাকা সাইবা। ১ হাজার ২৬২ নম্বর পেয়ে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগে ১২তম হয়েছেন।
একই বিভাগে কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নাবিহা নওরিন ৫৯তম এবং চকরিয়া গ্রামার স্কুলের তাফহিমাতুন নুর সুরাইয়া ৯৪তম হয়েছেন।
অর্থাৎ বিজ্ঞান বিভাগের শীর্ষ ১০০-তে কক্সবাজারের তিনজনের মধ্যে জেলা শহরের প্রতিষ্ঠান থেকে রয়েছেন মাত্র একজন।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগেও একই চিত্র। শাক্যমুনি উচ্চ বিদ্যালয়ের স্মৃতি দাশ এবং ঈদগাহ আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের সুনিয়া সোলতানা জিগার ১ হাজার ১৮৫ নম্বর পেয়ে যৌথভাবে বিভাগে ৪০তম হয়েছেন। চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের আবরার তাজওয়ার তাহিয়াত ১ হাজার ১৮৩ নম্বর নিয়ে হয়েছেন ৪৬তম। ৭২ তম স্থান করেছেন ঈদগাও আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের সাবিহা জান্নাত সুজা ও ৮১ তম হয়েছেন আইডিয়াল ইন্সটিটিউট এর মাহিন আহমেদ নিরব।
এই বিভাগে জেলা শহরের কোনো স্কুলের শিক্ষার্থী শীর্ষ ১০০-তে নেই।
মানবিক বিভাগে কক্সবাজারের সাফল্য আরও বেশি চোখে পড়ার মতো।
পহরচাঁদা উচ্চ বিদ্যালয়ের জান্নাতুল মাওয়া ইসফা ১ হাজার ১৫৯ নম্বর পেয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে নবম হয়েছেন। মহেশখালী মডেল হাই স্কুলের রিজা ১৩তম এবং পোকখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের জান্নাতুল ফেরদৌস চুমকি ১৫তম হয়েছেন। ২২ তম হয়েছেন চকরিয়ার দিঘরপান খালী উচ্চ বিদ্যালয়ের নদি বড়ুয়া, ৩১ তম হয়েছেন রামুর কাউয়ারকোপ হাকিম রকিমা উচ্চ বিদ্যালয়ের উম্মে হাফসা, ৫৫ তম বাঁকখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের নিরব পাল, ৬০ তম চকরিয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ্সিদরাতুল মুনতাহা, ৬৩ তম একই স্কুলের সোহানা ফেরদৌস, একই স্থানে বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমির ছাত্রী সায়মা রুহানা রুমি, ৬৭ তম মহেশখালী মডেল হাইস্কুলের সানজিদা আকতার, ৮০ তম টেকনাফের হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়ের জান্নাতুল মাওয়া, ৮৪ তম কোনাখালীর করিম মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের আফসানা সুলতানা, ৯৪ তম বাঁকখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের হাসিবা সানজারা, ৯৬ তম একই বিদ্যালয়ের ইফতি আহমেদ সজিব।
এই বিভাগেও জেলা শহরের কোনো ‘নামকরা’ স্কুলের শিক্ষার্থী শীর্ষ ১০০-তে জায়গা পাননি।
তাহলে কি বদলে যাচ্ছে মেধার মানচিত্র?
চট্টগ্রাম বিভাগের শীর্ষ ১০০ শিক্ষার্থীর তালিকাটি শুধু কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প নয়, এটি কক্সবাজারের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি পরিবর্তিত চিত্রও সামনে আনছে।
দীর্ঘদিন ধরে বড় শহরের প্রতিষ্ঠানের নাম, অবকাঠামো, ফলাফল ও ভর্তি-প্রতিযোগিতাকে শিক্ষার মানের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু এবারের ফলাফল বলছে, ভালো ফলের জন্য শুধু প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নয়, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পারিবারিক সহায়তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর শিক্ষাদান পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জেলা শহরের বাইরে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য প্রচলিত ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
লটারি ভর্তি কি ‘ভালো স্কুল’গুলোর চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে?
কক্সবাজার সিটি কলেজের শিক্ষক অধ্যাপক মঈনুল হাসান পলাশ মনে করেন, স্কুলে লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি চালুর পর তথাকথিত নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, আগে যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের সুযোগ ছিল, লটারি পদ্ধতিতে সেই সুযোগ কমেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মেধাগত বৈচিত্র্যও বেড়েছে।
“পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই একজন শিক্ষকের কৃতিত্ব”, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য যাচাইয়ের অন্যতম উপায় হওয়া উচিত, তারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে।
অধ্যাপক পলাশের মতে, শুধু ভালো শিক্ষার্থী নিয়ে ভালো ফল করার চেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীকে ভালো ফলাফল করতে সক্ষম করে তোলাই শিক্ষকের বড় সাফল্য।
‘ভালো স্কুল’ বলতে আমরা কী বুঝি?
এই ফলাফল তাই আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে, একটি স্কুলকে আমরা কেন ‘ভালো’ বলি?
ভবনের আকার, শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান, ভর্তি নিয়ে অভিভাবকদের আগ্রহ কিংবা আগের বছরের ফলাফল, এসব কি একটি প্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট?
নাকি একটি স্কুলের প্রকৃত সাফল্য মাপা উচিত তার শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ, শিক্ষকতার মান, পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি এবং সামগ্রিক শিক্ষাগত পরিবেশ দিয়ে?
২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফলে কক্সবাজারের চিত্র অন্তত বলছে, মেধা শুধু শহরের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটকে নেই।
চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে বিভাগীয় ১২তম, পহরচাঁদা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে নবম, মহেশখালী মডেল হাই স্কুল থেকে ১৩তম কিংবা পোকখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৫তম, এই অবস্থানগুলো প্রমাণ করে, জেলার প্রত্যন্ত বা তুলনামূলক কম আলোচিত প্রতিষ্ঠান থেকেও বিভাগসেরা শিক্ষার্থী তৈরি হতে পারে।
সাফল্যের সঙ্গে যে প্রশ্নটি থেকে যায়
চট্টগ্রাম বিভাগের তিন শিক্ষা বিভাগে শীর্ষ ১০০ শিক্ষার্থীর তালিকায় কক্সবাজারের ৯ জনের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে জেলার জন্য গর্বের।
কিন্তু একই তালিকায় জেলা শহরের স্কুলগুলোর উপস্থিতি মাত্র একজনকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকা একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও রেখে যায়।
যে স্কুলগুলোকে এতদিন ‘ভালো স্কুল’ বলে অভিভাবকরা বাড়তি মূল্য দিয়েছেন, তাদের শিক্ষার্থীরা কেন বিভাগীয় মেধার তালিকায় পিছিয়ে পড়ল?
এটি কি কেবল একটি বছরের ফলাফল, নাকি কক্সবাজারের শিক্ষাব্যবস্থায় ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া মেধার মানচিত্রের ইঙ্গিত?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো শুধু ২০২৬ সালের ফলাফলে পাওয়া যাবে না। তবে এবারের ফলাফল অন্তত এতটুকু দেখিয়ে দিয়েছে, ভালো স্কুলের পরিচয় শুধু নামের মধ্যে নয়, ভালো স্কুলের আসল পরিচয় তার শিক্ষার্থীদের সাফল্যে।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!