কক্সবাজারে বাংলাদেশ ফুটবলের ‘নিজের বাড়ি’
রামুর এই ১৫ দশমিক ২০ একর জমি শুধু বাফুফের সম্পদ হবে না, হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ফুটবলের ঠিকানা। ৫৫ বছর পর, বাংলাদেশের ফুটবল যদি সত্যিই নিজের বাড়ি পেতে যাচ্ছে, তাহলে কক্সবাজারের রামু থেকে সেই নতুন গল্পটির শুরু হওয়াটা নিঃসন্দেহে প্রতীকীও।

মন্তব্য প্রতিবেদন । বে ইনসাইট
বাংলাদেশের ফুটবলের বয়স এখন ৫৫ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের ফুটবল অনেক পথ পেরিয়েছে, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে, সাফে সাফল্য পেয়েছে, ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে গেছে, নতুন প্রজন্ম এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে।
কিন্তু এই গল্পের একটি অদ্ভুত দিক আছে।
দেশের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বাফুফের নিজের কোনো পূর্ণাঙ্গ একাডেমি নেই। নেই নিজস্ব কোনো স্টেডিয়াম। এমনকি নিয়মিত অনুশীলনের জন্য নিজের একটি মাঠও নেই।
জাতীয় দলের ক্যাম্প করতে হয়েছে কখনো সরকারি মাঠে, কখনো অন্য প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোয়। বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড় তৈরি, আবাসন, পুনর্বাসন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের জন্যও স্থায়ী কোনো ঠিকানা গড়ে ওঠেনি।
এই বাস্তবতায় কক্সবাজারের রামুতে ১৫ দশমিক ২০ একর জমিতে যে টেকনিক্যাল সেন্টার হতে যাচ্ছে, সেটিকে শুধু আরেকটি ক্রীড়া অবকাঠামো হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো গল্পটি ধরা পড়বে না। এটি অনেকটা বাফুফের নিজের বাড়ি তৈরি হওয়ার গল্প।
—
এক লাখ এক টাকায় ৮ কোটি টাকার জমি
—
রামুর রশিদনগর ইউনিয়নে টেকনিক্যাল সেন্টারের জন্য যে জমি দেওয়া হচ্ছে, তার সরকারি মূল্য প্রায় আট কোটি টাকা।
বাফুফের পক্ষে এই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না। সংস্থাটি তাই সরকারের কাছে জমিটি বিনামূল্যে দেওয়ার আবেদন করে। শেষ পর্যন্ত সরকার বিশেষ বিবেচনায় প্রতীকী এক লাখ এক টাকায় জমি দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে।
টাকা জমাও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে যে সংস্থার নিজের একটি স্থায়ী ফুটবল অবকাঠামো ছিল না, সেই সংস্থার জন্য এখন ১৫ দশমিক ২০ একর জমির ওপর একটি স্থায়ী ঠিকানা তৈরির দরজা খুলেছে।
আর এখানেই এই প্রকল্পের তাৎপর্য।
কারণ ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। একটি জাতীয় দল তৈরি করতে হলে প্রয়োজন মাঠ, কোচ, আবাসন, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, জিম, প্রতিভা বাছাই এবং বছরের পর বছর ধরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে সেই অবকাঠামোগত ধারাবাহিকতাটিই সবচেয়ে বড় ঘাটতিগুলোর একটি।
—
যে বাড়ির দরজা সবার জন্য খোলা থাকার কথা
—
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রামুর এই টেকনিক্যাল সেন্টারে থাকবে আন্তর্জাতিক মানের তিনটি ফুটবল মাঠ। দুটি প্রাকৃতিক ঘাসের, একটি টার্ফের। থাকবে খেলোয়াড় ও কোচদের জন্য দুটি চারতলা ডরমিটরি। জিমনেসিয়াম, সুইমিংপুল, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, ক্যানটিন, কনফারেন্স কক্ষ, সব মিলিয়ে এটি শুধু অনুশীলনের মাঠ নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ ফুটবল প্রশিক্ষণকেন্দ্র হওয়ার কথা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হয়তো অন্য জায়গায়।
এখানে শুধু জাতীয় দলের ক্যাম্প হবে না। নারী ও পুরুষ, দুই দলের জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলের ক্যাম্প আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃণমূল থেকে প্রতিভা খুঁজে এনে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।
অর্থাৎ কক্সবাজারের রামুর এই জায়গাটি যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে ওঠে, তাহলে এটি এক অর্থে বাংলাদেশের ফুটবলের একটি স্থায়ী কারখানা হয়ে উঠতে পারে, যেখানে খেলোয়াড় শুধু তৈরি হবে না, তাদের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের ব্যবস্থাও থাকবে।
—
কিন্তু এই বাড়ি হতে এত দেরি কেন?
—
এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনের কাছে এই প্রকল্প এসেছিল প্রায় চার বছর আগে। প্রথম পরিকল্পনা ছিল কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালংয়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রায় ২০ একর জমিতে টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের।
তখন থেকেই আপত্তি ওঠে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আশঙ্কা করেছিল, ফুটবল অবকাঠামো তৈরির নামে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ক্ষতি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সেই জমির বরাদ্দ বাতিল করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বাফুফেকে অন্য জায়গায় জমি খুঁজতে বলা হয়।
এরপর নতুন জায়গা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, জমির মালিকানা ও আইনি জটিলতা, সব পেরিয়ে রামুর রশিদনগরে এসে থামল প্রকল্পটি।
অর্থাৎ বাফুফের নিজের বাড়ি তৈরির গল্পের শুরুটা খুব মসৃণ ছিল না।
বরং শুরুতেই একটি শিক্ষা ছিল, ফুটবলের উন্নয়ন করতে গিয়ে যেন পরিবেশের ক্ষতি না হয়।
এবার নতুন জায়গায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেই ভারসাম্য কতটা রাখা যায়, সেটিও নজরে রাখতে হবে।
—
ফিফার টাকায়, বাংলাদেশের মাটিতে
—
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফিফার অর্থায়ন।
বাফুফের টেকনিক্যাল কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টেকনিক্যাল সেন্টারের জন্য ফিফার কাছ থেকে দুই কিস্তিতে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ফিফার অর্থ পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল, প্রকল্পের জমির ওপর বাফুফের দীর্ঘমেয়াদি মালিকানা বা দখল নিশ্চিত করতে হবে।
কমপক্ষে ২০ বছরের স্থায়ী অধিকার না থাকলে অনুদানের সুযোগ নেই।
রামুর জমির ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে ৩০ বছরের লিজের ব্যবস্থা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেটি ৯৯ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
অর্থাৎ শুধু জমি পাওয়া নয়, আন্তর্জাতিক অর্থায়নের শর্ত পূরণ করে একটি দীর্ঘস্থায়ী ফুটবল অবকাঠামোর ভিত্তিও তৈরি হচ্ছে।
—
কক্সবাজার কেন?
—
এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা নয় কেন? দেশের অন্য কোনো বড় শহর নয় কেন?
এর একটি উত্তর হতে পারে, ফুটবলকে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া।
কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটন শহর। কিন্তু পর্যটনের পাশাপাশি এই জেলার রয়েছে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, বিস্তৃত উপকূলীয় এলাকা এবং ক্রীড়ার প্রতি আগ্রহ।
রামুর মতো জায়গায় একটি জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হলে সেটি শুধু জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের জন্য নয়, স্থানীয় তরুণদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
একজন কক্সবাজারের কিশোর হয়তো একদিন জাতীয় দলের জার্সি পরবে, এই স্বপ্ন দেখার জন্য ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
তার নিজের জেলার কাছেই থাকতে পারে সেই সুযোগ।
এই জায়গাটিই প্রকল্পটিকে শুধু বাফুফের অবকাঠামো না রেখে স্থানীয় মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও যুক্ত করে।
—
বাফুফের ‘নিজের বাড়ি’, তবে বাড়িটি কেমন হবে?
—
এখন অবশ্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নির্মাণ। বাংলাদেশে বড় প্রকল্প ঘোষণা করা নতুন কিছু নয়। জমি পাওয়া যায়, নকশা হয়, অর্থ বরাদ্দ হয়, কিন্তু প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কতটা মানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই আসল পরীক্ষা।
ফুটবলের এই টেকনিক্যাল সেন্টারও তাই কাগজে-কলমে কতটি মাঠ থাকবে, কত তলা ডরমিটরি হবে, সেটি দিয়ে বিচার করা যাবে না।
প্রশ্ন হবে, মাঠগুলো কতটা আন্তর্জাতিক মানের হচ্ছে?
ডরমিটরিতে খেলোয়াড়দের থাকার পরিবেশ কেমন?
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
নারী ফুটবলারদের জন্য নিরাপদ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত হচ্ছে কি না?
তৃণমূল থেকে প্রতিভা বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বিশাল অবকাঠামোটি বছরজুড়ে কীভাবে ব্যবহার করা হবে?
কারণ একটি ফুটবল ভবন বানানো সহজতর। কিন্তু সেটিকে একটি ফুটবল সংস্কৃতির কেন্দ্র বানানো অনেক কঠিন।
—
৫৫ বছরের অপেক্ষার পর
—
বাংলাদেশের ফুটবলে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো ধারাবাহিকতা।
প্রতিভা আসে। জাতীয় দলে জায়গা করে নেয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স, পুষ্টি, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক মানের অনুশীলনের সুযোগ কতজন নিয়মিত পায়?
এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো রামুর টেকনিক্যাল সেন্টার দিতে পারে।
ফিফার অর্থায়নে তিনটি মাঠ, ডরমিটরি, জিম, সুইমিংপুল, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, এসব সুবিধা যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি হয় এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে বাংলাদেশের ফুটবল অবকাঠামোর ইতিহাসে এটি একটি বড় পরিবর্তন হতে পারে।
আর তাই কক্সবাজারে যে জমি বাফুফে এক লাখ এক টাকার প্রতীকী মূল্যে পাচ্ছে, সেটির মূল্য শুধু আট কোটি টাকার হিসাব দিয়ে করা যায় না।
কারণ এই জমির ওপর তৈরি হতে পারে বাংলাদেশের ফুটবলের বহুদিনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় একটি জিনিস, নিজের একটি বাড়ি।
যেখানে জাতীয় দল ক্যাম্প করবে। যেখানে বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড়রা বড় হবে। যেখানে নারী ফুটবলারদের জন্যও থাকবে স্থায়ী জায়গা।
যেখানে কক্সবাজারের প্রত্যন্ত এলাকার কোনো কিশোর প্রথমবারের মতো বুঝতে পারবে, জাতীয় দলের স্বপ্নটা শুধু ঢাকার ছেলেদের জন্য নয়।
তবে বাড়ি বানানোই শেষ কথা নয়। বাড়িটিতে ফুটবল থাকতে হবে।
থাকতে হবে নিয়মিত অনুশীলন, প্রতিভা খোঁজা, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, নারী-পুরুষের সমান সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
তবেই রামুর এই ১৫ দশমিক ২০ একর জমি শুধু বাফুফের সম্পদ হবে না, হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ফুটবলের ঠিকানা।
৫৫ বছর পর, বাংলাদেশের ফুটবল যদি সত্যিই নিজের বাড়ি পেতে যাচ্ছে, তাহলে কক্সবাজারের রামু থেকে সেই নতুন গল্পটির শুরু হওয়াটা নিঃসন্দেহে প্রতীকীও।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!