Site Logo
English
ইনসাইট স্টোরি

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ২০ দিনে দুই শিশু চুরি

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তার জন্য বারবার পুলিশ চেয়েও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের বক্তব্য, নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ড থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা ও হাসপাতালের কর্মীদের উপস্থিতির মধ্যে শিশু চুরির ঘটনা ঘটায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

6 min read
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ২০ দিনে দুই শিশু চুরি

বে ইনসাইট রিপোর্ট

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২০ দিনের ব্যবধানে দুটি শিশু চুরির ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শিশু নিখোঁজ হওয়ায় হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড থেকে সাত মাস বয়সী একটি শিশুকে নিয়ে যায় এক নারী। এ সময় নিজের তিন মাস বয়সী শিশুকে সেখানে রেখে যায় সে। পরে ৯ অক্টোবর রাতে হাসপাতালের নবজাতক ও বিশেষ পরিচর্যা ইউনিট (স্ক্যানু) থেকে চুরি হয় আরেকটি নবজাতক।

দুই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, হাসপাতালের বেশিরভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা বিকল। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তার জন্য বারবার পুলিশ চেয়েও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়নি।

তবে পুলিশের বক্তব্য, নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ড থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা ও হাসপাতালের কর্মীদের উপস্থিতির মধ্যে শিশু চুরির ঘটনা ঘটায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

একটি শিশুকে রেখে আরেকটি নিয়ে যায় নারী

গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড থেকে সাত মাস বয়সী রাকিবকে নিয়ে যায় এক অজ্ঞাতপরিচয় নারী। ওই সময় তিন মাস বয়সী শিশুকে সেখানে রেখে যায় সে।

রাকিবের বাবা মোহাম্মদ রুবেল হোসেন জানান, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে তাঁরা ১৫ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

রুবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন এক নারী তাঁর স্ত্রীর কাছে এসে নিজের শিশুকে তাঁদের শয্যায় রাখেন। পরে রুবেলের ছেলে কান্না করায় তাকে কোলে নিয়ে শান্ত করার প্রস্তাব দেন ওই নারী।

প্রথমে রাজি না হলেও দ্বিতীয়বার অনুরোধ করার পর শিশুটিকে কোলে দেন রুবেলের স্ত্রী। কিছুক্ষণ পর ওই নারীকে আর দেখতে না পেয়ে খোঁজ শুরু করেন তাঁরা।

রুবেল বলেন, পরে সিসিটিভি ফুটেজে এক নারীকে তাঁদের শিশুকে নিয়ে আরও দুই মেয়েশিশুর সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চলে যেতে দেখা যায়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারীকে বহনকারী চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, তিনি উখিয়ার সোনারপাড়ার দিকে গিয়েছিলেন। সেখানে খোঁজ করেও শিশুটির সন্ধান পাননি তাঁরা।

হাসপাতালে ফেলে যাওয়া তিন মাস বয়সী শিশুটিকে পরে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে চট্টগ্রামের রাউফাবাদের ছোটমণি নিবাসে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় ২০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

রুবেল বলেন, তাঁদের এটিই প্রথম সন্তান। সন্তান হারানোর পর থেকে তাঁরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

স্ক্যানু থেকে নবজাতক নিখোঁজ

প্রথম ঘটনার ২০ দিন পর, ৯ অক্টোবর রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালের স্ক্যানু ওয়ার্ড থেকে আরেকটি নবজাতককে নিয়ে যায় এক নারী।

হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, শিশুটির মা রোজিনা আক্তার ৭ অক্টোবর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর নবজাতক সন্তানটি স্ক্যানুতে চিকিৎসাধীন ছিল।

নথিতে বলা হয়েছে, ওই নারী রাত ৯টা ৪০ মিনিট থেকে ব্রেস্টফিডিং কক্ষের সামনে ঘোরাঘুরি করছিলেন। পরে রাত ১১টা ২৫ মিনিটে স্টেপ ডাউন ওয়ার্ডে ঢুকে শিশুটিকে নিয়ে জরুরি বিভাগ দিয়ে বেরিয়ে যান।

শিশুটির মা রোজিনা আক্তারের প্রশ্ন, গেট পাস ও বিশেষ পোশাকের বিধান থাকা একটি ওয়ার্ড থেকে কীভাবে একজন নারী নবজাতককে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন?

রোজিনার অভিযোগ, ওয়ার্ডের ভেতরের কারও সহযোগিতা ছাড়া এভাবে শিশুকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

রোজিনা বলেন, রাত ১১টা ১৭ মিনিটে শিশুকে দুধ খাওয়ানো ও পরিষ্কার করার পর তিনি কক্ষে যান। রাত আড়াইটার দিকে অন্য এক নারী শিশুটির কথা জানতে চাইলে তিনি খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

তাঁর অভিযোগ, ঘটনার পরপরই একজন চিকিৎসক তাঁকে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানাতে নিষেধ করে বলেছিলেন, তাঁরা শিশুটিকে খুঁজে দেখছেন। পরে রাত তিনটার দিকে তিনি নিজের মাকে ফোন করে বিষয়টি জানান।

বিয়ের পাঁচ বছর পর পাওয়া প্রথম ছেলে সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন বলে জানান রোজিনা।

“আমি কোনো ক্ষতিপূরণ বা বিচার বুঝি না, আমি শুধু আমার সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় ফেরত চাই,” বলেন তিনি।

এ ঘটনায় ১০ অক্টোবর হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা শিমুল কান্তি দে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। শিশুটির পরিবারও আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে।

‘বেশিরভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা বিকল’

দ্বিতীয় ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক রাজিব পাল বলেন, পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে শিশুকে নিয়ে যাওয়া নারীকে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাঁর মুখে মাস্ক ও বোরকা পড়া ছিল।

রাজিব পাল বলেন, হাসপাতালের বেশিরভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা বিকল। নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়টিও বিবেচনায় রেখে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

প্রথম ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, তাঁদের তদন্ত চলছে এবং কাজ অনেক দূর এগিয়েছে।

তবে দুটি ঘটনায় একই চক্র জড়িত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কোনো ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার হয়নি এখনো। 

নিরাপত্তার দায়িত্ব কার, প্রশ্ন সেখানেই

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিংঞো বলেন, নিরাপত্তার জন্য পুলিশ চেয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ পাওয়া যায়নি।

তাঁর দাবি, ঈদ ও দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশ চাওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পরও পুলিশ সুপারের কাছে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ডা. মং টিংঞো বলেন, হাসপাতালের ভেতরে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের যাতায়াতের মধ্যে ছদ্মবেশে কেউ প্রবেশ করলে তাকে শনাক্ত করা কঠিন। তবে হাসপাতালের কোনো কর্মীর অবহেলা বা সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান বলেন, হাসপাতালের পুলিশ বক্সে একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে চার থেকে পাঁচজন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালের প্রতিটি পয়েন্টে ১০ থেকে ১২ জন করে পুলিশ মোতায়েন করা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, শিশু চুরির ঘটনাগুলো ঘটেছে নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ডে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত। সিসিটিভি, নার্স ও আয়ার উপস্থিতির মধ্যেও এমন ঘটনা ঘটায় হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

অহিদুর রহমানের ভাষ্য, আগে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করতেন। পরে বাজেট সংকট বা অভ্যন্তরীণ সমস্যায় তাঁদের সরিয়ে নেওয়া হয়। নিরাপত্তা জোরদারে আনসার পুনর্বহালের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তদন্ত কমিটি, কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাকি

দুটি ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান ডা. মিজানুর রহমান; সদস্য আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শান্তনু ঘোষ এবং সদস্যসচিব আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সিরাজুদ্দীন মাহমুদ সোহেল।

কমিটির সদস্য ডা. শান্তনু ঘোষ বলেন, লিখিত বক্তব্য গ্রহণ ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের কাজ চলমান থাকায় নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। শনিবার বা রোববারের মধ্যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত হতে পারে বলে আশা করছেন তাঁরা।

তিনি জানান, হাসপাতালের ভেতরের ফুটেজে সন্দেহভাজন নারীর চলাচলের কিছু দৃশ্য পাওয়া গেলেও বাইরের দিকের কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজে সমস্যা রয়েছে বা দৃশ্য স্পষ্ট নয়।

ডা. শান্তনু ঘোষের ভাষ্য, ২০১৯-২০২০ সালের দিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় হাসপাতালের সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছিল। সেগুলো সচল রাখা ও ব্যাকআপের ব্যবস্থা হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ঠিকঠাক করা নিয়েও জটিলতা আছে। 

ভাঙচুরের পরও অনিশ্চয়তা

দ্বিতীয় শিশু চুরির ঘটনার পরদিন, ১০ অক্টোবর ক্ষুব্ধ স্থানীয় লোকজন ও রোগীর স্বজনেরা হাসপাতালে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন বলে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরপর দুটি ঘটনায় রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

এখন প্রশ্ন শুধু কে বা কারা শিশু দুটিকে নিয়ে গেল, তা নয়। নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ডে কীভাবে বহিরাগত প্রবেশ করে শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারল, কেন সিসিটিভি ব্যবস্থা সচল ছিল না এবং নিরাপত্তার ঘাটতির দায় কার, সেসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন বলে মনে করেন সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা। 

তিনি বলেন, কিন্তু দুটি ঘটনার পর হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

এদিকে এই ঘটনার পর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আতংক বিরাজ করছে। রামুর মরিচ্যা থেকে আসা তসলিমা আক্তার সর্বশেষ চুরির ঘটনার সময় তার রোগী নিয়ে হাসপাতালেই ছিলেন।

তিনি বলেন, চুরির আগে আর পরে নিরাপত্তা কড়াকড়ি বেড়েছে ঠিক, কিন্তু আমাদের ভয় লাগে। রাতে কেউ ঘুমাই না। 

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!