কক্সবাজার শহর নিয়ে কি হচ্ছে মাস্টার প্ল্যানে?
এমন একটি শহরের কল্পনা করছেন যেখানে একজন ব্যবসায়ী সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ব্যবসায়িক কাজে যেতে পারবেন; পথে পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন, কোথাও বসবেন, প্রয়োজনীয় কাজ করবেন এবং আবার হাঁটতে হাঁটতে কিংবা গণপরিবহনে গন্তব্যে পৌঁছাবেন।

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।
কক্সবাজার শহরের যানজট কমাতে শুধু রাস্তা বড় করার বদলে নদীপথকে যোগাযোগব্যবস্থার অংশ করা, শহরের প্রধান সড়কগুলোকে হাঁটাবান্ধব ‘গ্রিন করিডর’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং ছোট শাটল বাস চালুর প্রস্তাব করছে কক্সবাজারের নতুন মাস্টার প্ল্যানের ডিজাইন টিম।
একই সঙ্গে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে এমন অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে পানির পথ সচল রাখা, আবর্জনায় বন্ধ হয়ে থাকা ড্রেন পরিষ্কার করা এবং সব জায়গায় কংক্রিটের ড্রেন নির্মাণ না করে কিছু অংশে সবুজ ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হচ্ছে।
উপকূল রক্ষায়ও কংক্রিটের বাঁধ বা রিটেইনিং ওয়ালকে একমাত্র সমাধান হিসেবে না দেখে বালু, ভূমির ঢাল, গাছপালা ও প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপকে কাজে লাগানোর পক্ষে তারা।
আর কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়ন বলতে শুধু বেশি পর্যটক কিংবা বড় বড় হোটেল নির্মাণকে বোঝাতে চান না মাস্টার প্ল্যানের ডেপুটি লিড-২ ও স্থপতি-নগর নক্সাবিদ এহসান খান। তার প্রস্তাব, পরিবেশবান্ধব, স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কম-প্রভাবের পর্যটন।
কক্সবাজারের মাস্টার প্ল্যানের কাজের সঙ্গে যুক্ত এহসান খান বে ইনসাইট এর সাথে এক আলাপচারিতায় এসব পরিকল্পনা ও ভাবনার কথা জানিয়েছেন।
তার বক্তব্যে কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার একটি ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়, যেখানে যোগাযোগের সমাধান শুধু সড়কে নয়, নদীতেও, শহরের প্রাণ শুধু গাড়িতে নয়, পথচারীতেও; আর উপকূল রক্ষার সমাধান সবসময় কংক্রিটে নয়, প্রকৃতিতেও খোঁজা হচ্ছে।
সরকারি মাস্টার প্ল্যানের কাঠামোতেও পরিবহন ও যোগাযোগ, পর্যটন উন্নয়ন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং ড্রেনেজ নেটওয়ার্ককে পৃথক পরিকল্পনা খাত হিসেবে রাখা হয়েছে।
কক্সবাজারের যোগাযোগ কি শুধু সড়কনির্ভর হবে?
কক্সবাজারের মতো একটি উপকূলীয় অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন মানেই নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ, এই ধারণার বাইরে যেতে চাইছে মাস্টার প্ল্যানের ডিজাইন টিম।
এহসান খানের যুক্তি, একটি এলাকার সব ধরনের যোগাযোগের জন্য সড়ক ব্যবহার করা জরুরি নয়। রেল এসেছে, সড়ক আছে; এর পাশাপাশি কক্সবাজারের নদী ও জলপথকেও কাজে লাগানো যেতে পারে।
বিশেষ করে মহেশখালীর সঙ্গে কক্সবাজার শহরের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় সড়ক বা সেতু নির্মাণের পরিবর্তে নৌপথের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
তার ভাষায়, মহেশখালী একটি ছোট পরিসরের শহর। কক্সবাজারের সঙ্গে সেখানে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের নৌ-সংযোগ তৈরি করা সম্ভব হলে সব যোগাযোগের জন্য বড় সড়কের প্রয়োজন হবে না।
এ জন্য কক্সবাজারের বিদ্যমান বিআইডব্লিউটিএ ঘাটকে আধুনিক করার প্রস্তাব রয়েছে।
সেখানে ওয়াটার ট্যাক্সি কিংবা ওয়াটার বাস চালুর কথা ভাবা হচ্ছে।
এহসান খান বলেন, কক্সবাজার-মহেশখালী যোগাযোগের পাশাপাশি এই নৌপথকে আরও বিস্তৃত করে টেকনাফ, ইনানী এবং উপকূলীয় অন্যান্য এলাকার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা সম্ভব।
শুধু যাত্রী পারাপার নয়, স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অংশ হিসেবেও এই জলপথকে ফিরিয়ে আনার চিন্তা রয়েছে।
মহেশখালী, শাপলাপুর, কুতুবদিয়া, মাতারবাড়ীসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই নৌযানের ওপর নির্ভরশীল। সেই বাস্তবতাকে নগর পরিকল্পনার অংশ করার কথা বলছেন তিনি।
‘রাস্তায় সব কানেক্টিভিটি নিতে হবে, এটা ঠিক না’
এহসান খানের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যোগাযোগব্যবস্থাকে একক কোনো মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল না করা।
তার মতে, সড়ক, রেল এবং নৌপথকে আলাদা আলাদা প্রতিযোগী হিসেবে দেখলে হবে না। বরং কোন এলাকায় কোন মাধ্যম সবচেয়ে কার্যকর ও পরিবেশসম্মত, সেটি নির্ধারণ করতে হবে।
মাস্টার প্ল্যানে জাতীয় পর্যায়ের প্রধান যোগাযোগের জন্য এন-ওয়ানকে প্রাথমিক করিডর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি আঞ্চলিক বা স্থানীয় যোগাযোগের জন্য জাতীয় মহাসড়কের মতো অবকাঠামো প্রয়োজন নেই।
এখানে নদীপথ একটি বিকল্প হতে পারে।
এহসান খানের মতে, কক্সবাজারের জলপথে এমন অনেক ‘লুপ’ তৈরি করা সম্ভব, যেগুলো শহর ও উপকূলীয় জনপদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি করবে।
এই ধরনের নৌযোগাযোগের জন্য কয়েকটি ঘাট ও টার্মিনাল উন্নয়নের প্রস্তাবও রয়েছে।
তার ভাষায়, বাংলাদেশে ১০-১৫ বছর ধরে ওয়াটারওয়ে কানেক্টিভিটির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে খুব বেশি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি।
তার ধারণা, একটি-দুটি ভালো উদাহরণ তৈরি হলে মানুষের মধ্যে এই ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি হবে।
কক্সবাজার শহর: বড় রাস্তা নয়, ‘নেটওয়ার্ক’
শহরের ভেতরের যোগাযোগ নিয়েও একই ধরনের দর্শন রয়েছে।
এহসান খানের মতে, কক্সবাজার শহরের সব রাস্তা প্রশস্ত করে ফেলার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়।
কারণ শহরের অনেক অভ্যন্তরীণ রাস্তা ২০ ফুটের মতো সরু এবং এর দুই পাশে ইতোমধ্যে বাড়িঘর তৈরি হয়েছে।
সেসব জায়গায় হঠাৎ করে রাস্তা বড় করতে গেলে মানুষের বসতবাড়ি ও স্থাপনা ভাঙার প্রয়োজন হবে।
তার বদলে ছোট ছোট রাস্তার একটি সংযুক্ত নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চান তারা।
প্রধান সড়ক, সেকেন্ডারি সড়ক এবং পাড়ার ছোট ফিডার সড়ক, এই তিন স্তরের যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে।
কোথাও ৩০ ফুট, কোথাও সুযোগ থাকলে ৪০ ফুট পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। তবে সড়কের প্রস্থের পাশাপাশি ফুটপাত ও গাছের ছায়াকেও নকশার অংশ হিসেবে দেখছেন তারা।
তিন কিলোমিটারের শহর
কক্সবাজার শহরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় হাঁটাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি কারণ হলো শহরের কর্মকাণ্ডের পরিসর।
এহসান খান বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের বড় অংশ একটি তুলনামূলক ছোট ব্যাসার্ধের মধ্যে রয়েছে।
সেখানে প্রতিটি যাত্রার জন্য রিকশা, অটোরিকশা কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভর করলে শহরের ওপর যানবাহনের চাপ বাড়বে।
তাই শহরের প্রধান সড়কগুলোকে ‘ওয়াকেবল’ বা হাঁটার উপযোগী করার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রধান সড়কের একটি ত্রিভুজাকার কাঠামোর কথা বলেছেন তিনি, রেলস্টেশন থেকে ঝাউতলা, সেখান থেকে কলাতলী এবং রেলস্টেশন থেকে ডলফিন মোড়ের দিকে যাওয়া সংযোগগুলোকে প্রধান করিডর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই করিডরে থাকবে ফুটপাত, গাছের ছায়া ও হাঁটার পরিবেশ।
তার ভাষায়, এটি হবে ‘গ্রিন করিডর’।
অর্থাৎ, শহরের উন্নয়ন শুধু গাড়ির গতি বাড়ানোর জন্য নয়; মানুষ যেন হাঁটতে পারে, সেটিও উন্নয়নের একটি সূচক।
‘ব্যবসায়ী হাঁটবে, শ্রমিকও হাঁটবে’
এহসান খানের বক্তব্যে ‘ওয়াকেবল সিটি’ ধারণার একটি সামাজিক দিকও রয়েছে।
তিনি এমন একটি শহরের কল্পনা করছেন যেখানে একজন ব্যবসায়ী সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ব্যবসায়িক কাজে যেতে পারবেন; পথে পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন, কোথাও বসবেন, প্রয়োজনীয় কাজ করবেন এবং আবার হাঁটতে হাঁটতে কিংবা গণপরিবহনে গন্তব্যে পৌঁছাবেন।
কিন্তু শুধু ব্যবসায়ী বা পর্যটক নয়, একজন শ্রমিকও যেন একই সুবিধা পান, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তার যুক্তি, হাঁটাবান্ধব শহরের সুবিধা শ্রেণিভেদে আলাদা হওয়া উচিত নয়।
একজন ব্যবসায়ী যেমন ছায়াযুক্ত ফুটপাত ব্যবহার করবেন, একজন শ্রমিকও করবেন।
একজন পর্যটক যেমন নিরাপদে হাঁটবেন, স্থানীয় বাসিন্দারও একই অধিকার থাকবে।
১০-২০ টাকার শাটল বাস
হাঁটার পাশাপাশি গণপরিবহনকে কার্যকর করতে ছোট শাটল বাস চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
এহসান খান ১২ থেকে ২০ জনের ধারণক্ষমতার ছোট বাসের কথা বলেছেন।
তার মতে, কক্সবাজার শহরের মতো জায়গায় সবসময় বড়, এসি বাস চালানোর প্রয়োজন নেই।
ছোট বাস নির্দিষ্ট রুটে ঘুরে ঘুরে মানুষকে প্রধান করিডরের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
ভাড়া ১০, ১৫ বা ২০ টাকার মতো রাখা সম্ভব হলে এটি স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন পরিবহনের অংশ হতে পারে।
এর ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
এখানে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে আলাদা পরিবহনব্যবস্থায় না রেখে একই শহুরে গণপরিবহন কাঠামোর মধ্যে আনার চিন্তা রয়েছে।
কক্সবাজারের বড় নগর সমস্যা: পানি
কক্সবাজারের নগর পরিকল্পনায় এহসান খান যে বিষয়টিকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন, সেটি হলো পানির স্বাভাবিক প্রবাহ।
কক্সবাজারের ভূপ্রকৃতিতে পাহাড়ি অঞ্চল থেকে পানি নিচের দিকে নামে। শহরের বিভিন্ন অংশ পেরিয়ে সেই পানি সমুদ্র বা বাঁকখালী নদীর দিকে যাওয়ার কথা।
কিন্তু কোনো সড়ক, বাঁধ বা অন্য অবকাঠামো পানির পথ আটকে দিলে পানি জমে যেতে পারে।
এহসান খান বলেন, কোনো কোনো জায়গায় উঁচু করে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে, যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে।
তার মতে, সেখানে রাস্তা তৈরির সময় পানির জন্য পর্যাপ্ত ‘ওভারফ্লো’ বা প্রবাহের ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল।
অর্থাৎ, নগর অবকাঠামোকে শুধু যানবাহনের জন্য নয়, পানির গতিপথ বিবেচনা করেও নকশা করতে হবে।
‘ড্রেন পরিষ্কার করলেই অনেক কাজ হয়ে যায়’
কক্সবাজারের জলাবদ্ধতার সমাধানে নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণকেও তিনি বড় বিষয় হিসেবে দেখছেন।
তার বক্তব্য, শহরের অনেক ড্রেন আবর্জনায় বন্ধ হয়ে আছে।
ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে পারে না।
এহসান খান জানান, বিদেশি পরামর্শকরাও কক্সবাজারের মাস্টার প্ল্যান তৈরির সময় শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবস্থা দেখে ড্রেন পরিষ্কার করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তার বক্তব্যের সারকথা, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন অবকাঠামো করার আগে বিদ্যমান ড্রেনগুলো সচল করা দরকার।
তবে ড্রেন পরিষ্কার করাই শেষ সমাধান নয়।
ড্রেন কীভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সব ড্রেন কংক্রিটে ঢেকে ফেলতে চান না
এহসান খানের মতে, শহরের সব ড্রেনকে একেবারে কংক্রিটের দেয়ালে আবদ্ধ করে ফেললে শুধু পানি নিষ্কাশন হবে, কিন্তু পরিবেশগত কিছু সুবিধা হারিয়ে যেতে পারে।
তাই কিছু ড্রেন খোলা রাখার এবং সেখানে সবুজ উপাদান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
তার মতে, কংক্রিটের সম্পূর্ণ আবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে জীববৈচিত্র্যের সুযোগ কম থাকে।
অন্যদিকে খোলা ও সবুজ ড্রেনের কিছু অংশে উদ্ভিদ, পোকামাকড় ও ক্ষুদ্র জীবের জন্য পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে গাছের ছায়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশও তৈরি হবে।
অর্থাৎ, ড্রেনকে শুধু ‘বর্জ্য ও পানি বহনের নালা’ হিসেবে না দেখে শহরের পরিবেশ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার প্রস্তাব রয়েছে।
শহর রক্ষাবাঁধ: কংক্রিটই কি শেষ কথা?
কক্সবাজারের উপকূল রক্ষায় শহর রক্ষাবাঁধ বা সমুদ্রের পাশে প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ নিয়েও এহসান খানের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
তার প্রশ্ন, সমুদ্রের ভাঙন ঠেকাতে প্রতিটি জায়গায় কংক্রিটের দেয়াল বা রিটেইনিং ওয়াল তৈরি করাই কি একমাত্র সমাধান?
তিনি মনে করেন, উপকূল সুরক্ষায় প্রকৃতিনির্ভর পদ্ধতিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
এই ধারণায় বালু, প্রাকৃতিক ঢাল, গাছপালা ও ল্যান্ডস্কেপকে উপকূল সুরক্ষার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
তার মতে, সমুদ্র থেকে ঢেউয়ের সঙ্গে যে বালি আসে, প্রাকৃতিক ভূমি অক্ষুণ্ন থাকলে সেই বালি জমে বালিয়াড়ি তৈরি করতে পারে।
কিন্তু উপকূলকে পুরোপুরি কংক্রিট দিয়ে আটকে দিলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এহসান খান তাই কংক্রিটের পরিবর্তে যেখানে সম্ভব সেখানে প্রাকৃতিক ভূমি ও বালিয়াড়িকে উপকূল সুরক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহারের কথা বলছেন।
‘নেচার-বেসড’ শহর রক্ষা
উপকূল সুরক্ষার এই চিন্তাকে তিনি বৃহত্তর একটি পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এখন প্রকৃতিকে ব্যবহার করে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ঝুঁকি মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে কাজ হচ্ছে।
তিনি জাপানের সুনামি-পরবর্তী অভিজ্ঞতা এবং নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের মতো জায়গার উদাহরণ টেনে বলেন, বড় প্রকৌশল কাঠামোর পাশাপাশি প্রকৃতিনির্ভর সমাধানও এখন আলোচনায় এসেছে।
তবে বিদেশের কোনো মডেল সরাসরি কক্সবাজারে বসিয়ে দেওয়ার পক্ষেও তিনি নন।
কারণ কক্সবাজারের ভূমি, জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাপন আলাদা।
তার বক্তব্যে তাই মূল প্রশ্ন, কক্সবাজারের নিজস্ব প্রকৃতি কীভাবে শহরকে রক্ষা করতে পারে?
‘কর্নিশ’ বানালেই কক্সবাজার বদলে যাবে না
বিশ্বের বিভিন্ন শহরের সমুদ্রতীরবর্তী ‘কর্নিশ’ দেখে কক্সবাজারেও একই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের প্রবণতা নিয়েও সতর্ক করেছেন এহসান খান।
মধ্যপ্রাচ্যের কিছু শহরে বড় সমুদ্রতীরবর্তী উন্মুক্ত জায়গা, হাঁটার পথ ও বিনোদনকেন্দ্রের ‘কর্নিশ’ সফল হয়েছে।
কিন্তু সেই মডেল কক্সবাজারে সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না বলে মনে করেন তিনি।
কারণ কক্সবাজারের ভূমি সীমিত, জলবায়ু আর্দ্র এবং এখানকার পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতি প্রকৃতির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
অতএব, বিদেশি কোনো নকশা কপি করার পরিবর্তে কক্সবাজারের প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান তৈরি করতে হবে।
পর্যটন: বেশি মানুষ, নাকি ভালো পর্যটক?
কক্সবাজারের পর্যটন নিয়ে এহসান খানের বক্তব্যও প্রচলিত উন্নয়ন ধারণার সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন।
তার মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেই পর্যটনের উন্নয়ন হয় না।
বরং কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটনের মান বা ‘কোয়ালিটি’ কমে যাওয়ার প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
তাই ভবিষ্যৎ পর্যটন পরিকল্পনার লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘কোয়ালিটি ট্যুরিজম’।
তার মতে, পর্যটনকে একই সঙ্গে তিনটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, পর্যটনবান্ধব পরিবেশ এবং বিনিয়োগবান্ধব ব্যবস্থা।
তবে এই তিনটির মধ্যে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এহসান খানের প্রস্তাব, পরিবেশ ও পর্যটনকে মূল ভিত্তি ধরে বিনিয়োগকে সেই কাঠামোর মধ্যে আনা।
অর্থাৎ বিনিয়োগের ধরন ঠিক করবে পরিবেশ ও পর্যটনের চরিত্র।
কক্সবাজারে সব জায়গায় ২০ তলা হোটেল নয়
কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়ন নিয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, বড় বড় হোটেল, রিসোর্ট ও বহুতল ভবনই কি পর্যটনের ভবিষ্যৎ?
এহসান খান এর পক্ষে নন।
তিনি এমন একটি পর্যটন মডেলের কথা বলেছেন যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইকো-রিসোর্ট তৈরি হবে।
তার মতে, সব জায়গায় ১০, ১৫ কিংবা ২০ তলা হোটেল তৈরি করার প্রয়োজন নেই।
বরং কক্সবাজারের বিভিন্ন অংশের জন্য আলাদা পর্যটন চরিত্র নির্ধারণ করা যেতে পারে।
কোথাও তুলনামূলক ঘন ও উচ্চমানের হোটেলভিত্তিক পর্যটন থাকবে, আবার কোথাও থাকবে প্রকৃতিনির্ভর ইকো-রিসোর্ট।
অর্থাৎ ‘এক মডেলের পর্যটন’ নয়, বরং জায়গাভেদে ভিন্ন ধরনের পর্যটন।
টেকনাফেও পর্যটনকেন্দ্র?
এহসান খানের বক্তব্যে কক্সবাজারের পর্যটনকে শহরকেন্দ্রিক না রাখার ধারণাও এসেছে।
তার মতে, কক্সবাজার শহরের পাশাপাশি টেকনাফ শহরের আশপাশেও আলাদা পর্যটন জেলা বা পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে।
এতে একদিকে বিনিয়োগের জন্য জায়গা তৈরি হবে, অন্যদিকে কক্সবাজার শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে।
কিছু এলাকায় বড় হোটেল ও বিনিয়োগভিত্তিক পর্যটন থাকতে পারে।
আবার মেরিন এলাকার মতো সংবেদনশীল জায়গায় প্রকৃতিনির্ভর রিসোর্ট থাকতে পারে।
তার যুক্তি, ইকো-রিসোর্ট মানেই নিম্নমানের পর্যটন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় উচ্চমানের ইকো-রিসোর্টও রয়েছে।
অর্থাৎ ‘ইকো’ এবং ‘লাক্সারি’, এই দুটিকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
স্থানীয় মানুষ থাকবে, পর্যটনও থাকবে
পর্যটন উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় বসতি।
এহসান খান মনে করেন, পর্যটন উন্নয়নের নামে স্থানীয় জেলে বা গ্রামীণ বসতিকে সরিয়ে দিলে সেই পর্যটন টেকসই হবে না।
বরং পর্যটনকে স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
এ জন্য তিনি গ্রামীণ বাড়িঘরের ধারণা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা বলেছেন, খোলামেলা বারান্দা, কম উচ্চতার ভবন, উঠান, সবুজ জায়গা এবং পানি শোষণের জন্য খোলা জমি।
অর্থাৎ পর্যটন এলাকার ভবনও স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানানসই হতে পারে।
এতে পর্যটক শুধু হোটেলের ভেতর বন্দি থাকবেন না; স্থানীয় জীবন, প্রকৃতি ও গ্রামীণ পরিবেশও পর্যটনের অংশ হয়ে উঠবে।
উন্নয়নবিরোধী নয়, ‘সেন্সিটিভ ডেভেলপমেন্ট’
এহসান খান বারবার একটি বিষয় পরিষ্কার করেছেন, তিনি উন্নয়নবিরোধী নন।
তার মতে, বাংলাদেশের মতো দ্রুত অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের দেশে হাসপাতাল, স্কুল, বাজার, কর্মসংস্থান, রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করতেই হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সেই উন্নয়ন কতটা সংবেদনশীলভাবে করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় উন্নয়নের প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রকৃতি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তার কাছে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়।
বরং প্রশ্ন, দুটিকে কীভাবে একসঙ্গে রাখা যায়।
মাস্টার প্ল্যানের পরীক্ষা বাস্তবায়নে
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সরকারি তথ্যেও মাস্টার প্ল্যানের উদ্দেশ্য হিসেবে ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার, অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের পাশাপাশি বৃহত্তর এলাকার জন্য স্ট্রাকচার প্ল্যান তৈরির কথা রয়েছে।
ফলে এহসান খানের বক্তব্যে উঠে আসা প্রস্তাবগুলো শুধু নকশার প্রশ্ন নয়; শেষ পর্যন্ত এগুলো বাস্তবায়নের প্রশ্নও।
একটি নদীপথকে গণপরিবহনে আনতে হলে ঘাট, টার্মিনাল, নৌযান ও ব্যবস্থাপনা দরকার।
একটি শহরকে হাঁটাবান্ধব করতে হলে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, ছায়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।
ড্রেনেজ সচল রাখতে শুধু নতুন ড্রেন নয়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও প্রয়োজন।
আর প্রকৃতিনির্ভর উপকূল সুরক্ষা করতে হলে প্রকৌশল, পরিবেশবিদ্যা ও নগর পরিকল্পনার সমন্বিত জ্ঞান দরকার।
এহসান খান নিজেও বলেছেন, পেশাজীবীদের কাজ হলো উন্নয়ন বন্ধ করা নয়; বরং জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেকসই উন্নয়নের পথ খুঁজে বের করা।
কক্সবাজারের সামনে তাই তিনটি বড় প্রশ্ন
কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে এহসান খানের বক্তব্যকে তিনটি বড় প্রশ্নে নামিয়ে আনা যায়।
প্রথমত, যোগাযোগের সব চাপ কি সড়কের ওপরই থাকবে?
তার উত্তর, না। নদীপথ, রেল ও ছোট গণপরিবহনকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শহর ও উপকূলকে রক্ষা করতে সব জায়গায় কংক্রিটই কি সমাধান?
তার উত্তর, না। পানি, বালু, গাছপালা ও প্রাকৃতিক ভূমির কাঠামোকেও অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তৃতীয়ত, পর্যটন মানে কি শুধু বেশি পর্যটক ও বেশি ভবন?
তার উত্তরও, না। কক্সবাজারের পর্যটনের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানসম্পন্ন, পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যটন।
কক্সবাজারের সরকারি মাস্টার প্ল্যানের ঘোষিত লক্ষ্যও অঞ্চলটিকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করে পর্যটন, অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার সুবিধা বাড়ানো; একই সঙ্গে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজকে পরিকল্পনার অংশ করা।
গাড়ির শহর নয়, মানুষের কক্সবাজার
এহসান খানের বক্তব্যে শেষ পর্যন্ত যে কক্সবাজারের ছবি তৈরি হয়, সেখানে শহরের সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কত কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হলো কিংবা কতগুলো নতুন হোটেল হলো, তা নয়।
বরং একজন মানুষ কত সহজে হেঁটে গন্তব্যে যেতে পারছেন, একজন শ্রমিক কত কম খরচে শহরে চলাচল করতে পারছেন, একজন মহেশখালীর বাসিন্দা কত দ্রুত নৌপথে কক্সবাজারে আসতে পারছেন, বর্ষার পানি কত দ্রুত শহর থেকে বের হতে পারছে, একটি উপকূলীয় এলাকা কংক্রিটের দেয়াল ছাড়াই কতটা নিরাপদ রাখা যাচ্ছে এবং পর্যটক কক্সবাজারে এসে শুধু একটি হোটেল নয়, প্রকৃতি ও স্থানীয় জীবনকে কতটা অনুভব করতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই কক্সবাজারের নতুন নগর ভাবনার মূল দ্বন্দ্ব।
উন্নয়ন থামানো নয়।
বরং কোন উন্নয়ন কক্সবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।
এহসান খানের ভাষায়, উন্নয়নের পক্ষে থাকা এবং পরিবেশের পক্ষে থাকা, এই দুটিকে পরস্পরের বিপরীত করে দেখার প্রয়োজন নেই।
পেশাজীবীদের দায়িত্ব হলো মাঝখানের সেই পথটি খুঁজে বের করা।
কক্সবাজারের মাস্টার প্ল্যান সেই পথ কতটা বাস্তবে দেখাতে পারে, আর বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো কতটা তা অনুসরণ করবে, শেষ পর্যন্ত সেটিই হবে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!