কক্সবাজার কে লেখা এক ভালোবাসার চিঠি: যে শহর আমাকে থেকে যেতে শিখিয়েছে
প্রাণের মায়ায় নিজের সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া মানুষদের জন্য এই জনপদ তার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

ছবি- লেখক
। মোশাররফ হোসেন ।
মানুষ সাধারণত নিত্যদিনের কর্মক্লান্তি ও একঘেয়ে জীবনযাপন থেকে সাময়িক স্বস্তি চায়। সেই প্রশান্তির খোঁজেই তাঁরা কক্সবাজারে আসে। কেউ ছুটে আসে প্রতিদিনের জীবনের বিশৃঙ্খলা থেকে, কেউ ভাঙা হৃদয় নিয়ে। কেউ শুধু সমুদ্রের পাশে স্বাধীনতার স্বাদ নিতে চায়। এই শহর কাউকেই ফিরিয়ে দেয় না।
কিন্তু আমার গল্পটা আলাদা। ২০১৯ সালে প্রথমবার কক্সবাজারে এসেছিলাম একটি পেশাগত কর্মশালায় অংশ নিতে। সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলেছিল সেই ব্যস্ত আয়োজন। সমুদ্র দেখারও সুযোগ হয়নি। কিন্তু ২০২১ সালের কোনো এক ভোরে আমি আবার ফিরে এলাম ব্যস্ত পর্যটন শহর কক্সবাজারে। ভোরবেলা বাস থেকে নেমে চারপাশ খুব অপরিচিত মনে হচ্ছিল। ততক্ষণে কক্সবাজার জেগে উঠেছে। কলরব বাড়ছে। চারপাশে হইচই। বাসস্ট্যান্ডে হরেক রকমের লোকের সমাগম। অথচ আমার নিজেকে তখন একদাম একা লাগছিল। যেন কোথাও কেউ নেই। হ্যাঁ, এবার সেই প্রাচীন পালংকী নামে পরিচিত জনপদে এসেছিলাম তিন মাসের একটি চাকরির চুক্তি নিয়ে। আমার পরিচয় হয়তো খুব বড়ো নয়; একজন মানবিক সহায়তা কর্মীর পরিচয়পত্র তখন আমার পকেটে। আর, সেই পরিচয়টুকুই কক্সবাজারের সঙ্গে আলাদা এক রসায়ন তৈরি করল!
তিন মাসের চুক্তির মেয়াদ পেরিয়ে আজ পাঁচ বছর ধরে আমি কক্সবাজারে।
কক্সবাজার; পর্যটন আর আনন্দ এখানে মিলেমিশে একাকার। কিন্তু আমার কাছে এটি আশ্রয়ের শহর। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে এই শহর। প্রাণের মায়ায় নিজের সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া মানুষদের জন্য এই জনপদ তার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই শহরে হাজার হাজার মানবিক সহায়তা কর্মীও জীবিকার তাগিদে ও পেশাগত কাজে বসবাস করেন, যাঁরা পৃথিবীটাকে একটু বাসযোগ্য করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
অভ্যস্ততা ভালোবাসা তৈরি করে কিংবা ভালোবাসাই মায়ার বাঁধনে সৃষ্টি করে কি না, সেই বিতর্ক তাত্ত্বিকদের জন্য তোলা রইল। কক্সবাজারে জীবিকার তাগিদে এসেছিলাম। আজ সেই কক্সবাজারের মায়ার বন্ধনে আমি আবদ্ধ।
প্রতিটি গভীর ভালোবাসার গল্পের মতোই, এই শহর আমার মননে আরও ছাপ রেখেছে। পাঁচ বছর আগের আমির সঙ্গে আজকের আমিকে মেলালে বেশ কিছু অমিল আমি খুঁজে পাই। তবে তা নেতিবাচক অর্থে নয়। মানবিক সহয়তা কর্মী হিসেবে এই শহর আমাকে ঢের খানিকটা মাটির কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘ফিরে চল মাটির টানে’-এর মাধ্যমে মানবিকতার যে অন্বেষণের আহ্বান করেছিলেন তার একটি নিগূঢ় অর্থ এই কক্সবাজারেরই আমি শিখেছি।
প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কক্সবাজারে আসে। কিন্তু কেউ থাকে না। প্রতিদিন সকালে ডলফিন মোড় আর কলাতলী রোডের আশপাশে এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি হয়। ছুটির দিনে এই ভিড় দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বাস থেকে নেমে আসে। খুব কমই কারও মুখে বিষণ্নতা দেখা যায়। তাদের চোখে থাকে স্বাধীনতার নির্মল আনন্দ। তাদের হাঁটার মধ্যেও তা বোঝা যায়। তারা এমনভাবে হাঁটে, যেন কেউ তাদের দেখছে না; মুক্ত বিহঙ্গের মতো তাঁদের এই হাঁটাচলা আমাকে স্বাধীনতার মূল্য শেখায়।
আমাদের মতো যাঁরা বুকের ভেতর ভারী কোনো কষ্ট নিয়ে চলি, তাদের মনের বিষাদের মেঘটুকুও এখানে অজান্তেই কেটে যায়। এখানে ক্লান্তি নেই। বিরক্তি স্পর্শ করে না। মানুষ নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ায়। ছোট শিশুরা সমুদ্রের বালিতে আনন্দে গড়াগড়ি খায়। বয়স্ক বাবা-মায়েরা সমুদ্রের পানিতে দুষ্টুমি করে একে অন্যকে ভিজিয়ে দেন। সূর্য ডোবার সময় প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেন। এটিকে ঠিক ‘ইভিনিং ইন প্যারিসের’ মতো আনন্দমাখা মুহূর্ত বলা যায় কি না, জানি না। তবে জীবনসংগ্রামকে পাশ কাটিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও আনন্দের এক ভুবন তৈরি করে।
তারপর সন্ধ্যা নামে পাখির নীড়ের মতো শুরু হয় বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাসগুলো ধীরে ধীরে শহর ছাড়তে শুরু করে। তখনও আমার চারপাশের সেই মানুষদের মুখে তৃপ্তির ছাপ খেলা করে। কিন্তু কলাতলী রোড ধরে হাঁটলে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করতে থাকি। মানুষ এত দ্রুত চলে যায়। চেষ্টা করেও তাদের আটকে রাখা যায় না।
ছুটি শেষ হয়। শহর আবার ফাঁকা হয়ে যায়। দিনের শেষে সবাই আসে, কিন্তু কেউ এখানে থিতু হয় না। কারও থেকে যাওয়ার সাহস নেই, সুযোগ নেই, কিংবা হয়তো ধৈর্যও নেই। শেষ পর্যন্ত সবাই কক্সবাজারকে পেছনে ফেলে চলে যায়। আমার মতো মানুষগুলো ছাড়া।
এখানে বসবাস মানেই স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। কখনো গভীর রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করি। দূর থেকে মাইকে ভেসে আসে কারও মৃত্যুর সংবাদ। ঢাকায় এমন ঘোষণা খুব কমই শুনেছি। এখানে এটি এক ধরনের ঐতিহ্য। স্থানীয়রা একে অন্যকে চেনেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের আধুনিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তবু মাইকের ঘোষণা এখনও টিকে আছে। অন্ধকারের মধ্যে প্রতিবার সেই ঘোষণা যখন ভেসে আসে, মনে হয় এই পৃথিবীতে আমাদের সময়টা আসলে কত অল্প।
কক্সবাজারের কিছু বিষয় সত্যিই অসাধারণভাবে কাজ করে। প্রথমটি হলো গভীর সামাজিক বন্ধন। খাবারের মধ্যেও তার ছাপ আছে। তাঁরা গরম ভাতের সঙ্গে ঝাল শুঁটকি ভর্তা খান। জিভ পুড়ে যায়, তবু খাওয়া থামাতে পারবেন না। তাজা সামুদ্রিক খাবারের প্রতিটি গ্রাসে সমুদ্রের স্বাদ পাওয়া যায়। স্থানীয় খাবারের স্বাদ মানুষকে এক টেবিলে বসায়। তবে স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। স্থানীয় বিয়েতে প্রায়ই যাওয়ার সুযোগ হয় আমার। তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ পাই। নিজেদের যা আছে, সেটুকুও তারা পরম আন্তরিকতায় ভাগ করে নেন।
দ্বিতীয়টি হলো সমুদ্রসৈকত। বঙ্গোপসাগর বিশাল এবং উদার। এটি এক অন্তহীন স্বস্তি দেয়।
সবশেষে আছে নীরবতা। ভিড় থেকে যথেষ্ট দূরে হাঁটলে পাওয়া যায় নৈশব্দের নির্যাস। কেবল ঊর্মিমালার কলধ্বনি শোনা যায়। সেই নীরবতা মনকে আপ্লুত করে ; আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মসমালোচনার দুয়ার খুলে দেয়।
তবে সত্যিকারের ভালোবাসা মানে প্রিয় জায়গাটার দুর্বলতাগুলোও দেখা। এই শহরকে রক্ষা করতে হলে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই পরিকল্পনা করতে হবে। কিছু বিষয় আমাদের বদলাতে হবে।
প্রথমত, শহরটির প্রতি আমাদের আরও যত্নশীল হতে হবে। রাস্তায় একটু বেশি ধৈর্য দেখালেই অনেক কিছু বদলে যায়। আমাদের একে অন্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। স্থানীয় মানুষ, পর্যটক এবং যারা নিজেদের ঘর হারিয়েছেন, সবার প্রতিই আমাদের আরও মানবিক হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের রাস্তা ও সমুদ্রসৈকতের আরও ভালোভাবে যত্ন নিতে হবে। সবাইকে সৈকত পরিষ্কার রাখতে হবে। সমুদ্রের পাশে পরিবার নিয়ে পিকনিক করলে নিজের আবর্জনা সঙ্গে নিয়ে ফিরুন। বালুর ওপর উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলবেন না। সমুদ্র একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা, ময়লার ভাগাড় নয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য শহরটির একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা খুবই জরুরি।
তৃতীয়ত, সমুদ্রের বাইরেও আনন্দ খুঁজে পাওয়ার আরও সুযোগ তৈরি করতে হবে। অতিথিদের বিনোদনের জন্য আমরা প্রায় পুরোপুরি সমুদ্রের ওপর নির্ভর করি। আমাদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সিনেমা হল, পাবলিক পার্ক এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জায়গা দরকার। পরিবার, পর্যটক ও এখানে কাজ করা মানুষের জন্য এমন জায়গা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে তারা একটু স্বস্তি পাবে এবং একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
চতুর্থত, অতিথিদের সত্যিকারের যত্ন নিতে হবে। দোকানদার থেকে রিকশাচালক পর্যন্ত সবাই আরও পেশাদার হতে পারেন। একজন পর্যটকের কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়া হয়তো দ্রুত কিছু বাড়তি আয় এনে দেবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এতে শহরেরই ক্ষতি হয়। একজন সন্তুষ্ট পর্যটক আবার ফিরে আসেন। সঙ্গে বন্ধুদেরও নিয়ে আসেন।
সত্যিকারের আতিথেয়তা মানে সম্পর্ক তৈরি করা। আস্থা তৈরি করতে এবং স্থানীয় বাজারকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের ন্যায্য দাম ও সৎ সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
কক্সবাজার আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে। আমাকে সহমর্মিতা শিখিয়েছে। এই শহর নীরবে মানবতার এক বিশাল ভার বহন করে চলেছে। যারা সবকিছু হারিয়েছে, এমন অসংখ্য মানুষের জন্য এটি নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোলা বাহু আর নীরব মমতায় তাদের জায়গা দিয়েছে।
আমি আশা করি, আমরাও এই শহরকে তার সেই সীমাহীন যত্নের কিছুটা ফিরিয়ে দিতে পারব। শহরটি আমাদের সম্মান পাওয়ার যোগ্য। আমাদের সুরক্ষার যোগ্য। আর সবচেয়ে বেশি, আমাদের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার যোগ্য।
লেখক-
মোশাররফ হোসেন, কক্সবাজারে কর্মরত একজন কমিউনিকেশনস পেশাজীবী। [mosharafhmsj@gmail.com]
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!