Site Logo
English
কক্সবাজার

এবারের জ্যৈষ্ঠ বদলে দিয়েছে অতীতের সব হিসাব-নিকাশ

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো কক্সবাজারেও বাড়ছে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা।

4 min read
এবারের জ্যৈষ্ঠ বদলে দিয়েছে অতীতের সব হিসাব-নিকাশ

আফজারা রিয়া

জ্যৈষ্ঠ মানেই গরম। কিন্তু এবারের জ্যৈষ্ঠ যেন অতীতের সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। সকাল গড়ানোর আগেই রোদের তেজ, আর দুপুরের আগেই ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। ফ্যানের বাতাসও যেন গরম, রাস্তাঘাট উত্তপ্ত, আর বাইরে বের হওয়া এক ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রঘেঁষা শহর কক্সবাজারেও মিলছে না সেই চিরচেনা স্বস্তি।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো কক্সবাজারেও বাড়ছে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা। যদিও জেলায় এখনো হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ঘটনা রেকর্ড হয়নি, তবুও গরমজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন চিকিৎসক ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা।

গরমজনিত অসুস্থতা বাড়ছে

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. রিপন চৌধুরী জানান, জেলায় এখন পর্যন্ত হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। তবে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা ও অতিরিক্ত গরমজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, “শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, শ্রমিক, কৃষক, জেলে, রিকশাচালকসহ যারা দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।”

তার মতে, হিট স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, বিভ্রান্তি এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

গরম থেকে সুরক্ষায় তিনি দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া, পর্যাপ্ত পানি ও খাবার স্যালাইন পান করা, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করলে নিয়মিত বিরতিতে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন।

সবচেয়ে বেশি কষ্টে খেটে খাওয়া মানুষ

গরমের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষরা।

কক্সবাজার শহরের রিকশাচালক আবদুল কাদের বলেন, “দুপুরের দিকে রাস্তায় থাকা খুব কষ্ট হয়ে যায়। মাথা গরম হয়ে যায়, শরীর দুর্বল লাগে। মাঝেমধ্যে ছায়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিতে হয়।”

শহরের বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, “আগে ফ্যান চালালেই আরাম পাওয়া যেত। এখন ঘরের ভেতরেও গরম লাগে। বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তায় থাকি।”

সমুদ্রসৈকতে কর্মরত এক ফটোগ্রাফার জানান, দীর্ঘ সময় রোদে থাকতে হওয়ায় প্রচুর পানি পান করতে হয়। তা না হলে মাথাব্যথা ও ক্লান্তি শুরু হয়।

কক্সবাজারে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কতটা?

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, বৃহস্পতিবার (৪ জুন) জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।

তিনি বলেন, “সাধারণত তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে তাপপ্রবাহ চলছে বলে ধরা হয়। তখন হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও বেশি থাকে। বর্তমানে কক্সবাজারে তাপপ্রবাহ নেই। তবে তাপপ্রবাহ না থাকলেও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

তার মতে, কক্সবাজারে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি গরম অনুভূত হয়। ফলে দীর্ঘ সময় খোলা রোদে কাজ করা ব্যক্তিদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কেন এত গরম?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মৌসুমি গরমের ফল নয়; এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত ৩০ বছরের গড় তাপমাত্রা বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে কক্সবাজার অঞ্চলে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩১ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে গড় তাপমাত্রা প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।”

তার মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং গরমের স্থায়িত্বও দীর্ঘ হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এল নিনো পরিস্থিতি।

এল নিনো কী, কক্সবাজারে এর প্রভাব কী হতে পারে?

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা World Meteorological Organization (ডব্লিউএমও) সতর্ক করেছে, আগামী মাসগুলোতে এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনো সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে আব্দুল হান্নান বলেন, “মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে এল নিনো বলা হয়। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরণে পরিবর্তন দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি খরা, তাপপ্রবাহ এবং অস্বাভাবিক গরমের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।”

তিনি আরও বলেন, “এল নিনো সরাসরি কক্সবাজারের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে না। তবে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর এর প্রভাব পড়ে। কক্সবাজার যেহেতু উপকূলীয় অঞ্চল, তাই তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার ধরণে এর পরোক্ষ প্রভাব দেখা যেতে পারে।”

তার মতে, সমুদ্রের কারণে কক্সবাজারের তাপমাত্রা তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত থাকলেও এল নিনো শক্তিশালী হলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গরম অনুভূত হতে পারে।

স্থানীয় পরিবেশও বাড়াচ্ছে তাপমাত্রা

জলবায়ু কর্মী জিমরাম মোহাম্মদ সায়েক মনে করেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশগত পরিবর্তনও তাপমাত্রা বৃদ্ধির বড় কারণ।

তিনি বলেন, “দ্রুত নগরায়ণের ফলে গাছপালা ও খোলা জায়গা কমছে, পুকুর-জলাশয় ভরাট হচ্ছে। অন্যদিকে কংক্রিটের দালানকোঠা দিনভর তাপ শোষণ করে পরিবেশকে আরও গরম করে তুলছে।”

তার ভাষায়, “অতিরিক্ত এসি ব্যবহারের ফলে বাইরে তাপ নির্গত হচ্ছে। একসময় যেসব এলাকায় সবুজ আর জলাশয় ছিল, সেখানে এখন কংক্রিটের আধিপত্য। এ কারণেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে।”

সতর্কবার্তা ভবিষ্যতের জন্য

এখন পর্যন্ত কক্সবাজারে হিট স্ট্রোকের বড় কোনো ঘটনা না ঘটলেও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সম্ভাব্য এল নিনো পরিস্থিতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাশয় সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। অন্যথায় উপকূলীয় এই শহরেও তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি আগামী দিনে আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!