Site Logo
English
কক্সবাজার

একটি ফাইনাল, যার কোনো চ্যাম্পিয়ন নেই!

কক্সবাজারে একটি ফুটবল ম্যাচ স্থগিত হয়েছিল দর্শকদের সহিংসতার কারণে। এক বছর পরও সেই ম্যাচ মাঠে গড়ায়নি। এর মধ্যে নতুন টুর্নামেন্ট হয়েছে, নতুন চ্যাম্পিয়নও পেয়েছে কক্সবাজার। কিন্তু জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপের সেই ফাইনাল যেন আটকে আছে একই জায়গায়।

6 min read
একটি ফাইনাল, যার কোনো চ্যাম্পিয়ন নেই!

। আবদু রশিদ মানিক ।

এক বছর আগে কক্সবাজারের বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে হাজারো মানুষের অপেক্ষা ছিল একটি ফুটবল ম্যাচ ঘিরে।

মাঠে নামার কথা ছিল টেকনাফ উপজেলা একাদশ ও রামু উপজেলা একাদশের।

জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল। অর্থাৎ পুরো টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচ।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেদিন কোনো খেলা হয়নি।

খেলা শুরুর আগেই কয়েক হাজার দর্শক স্টেডিয়ামের গেট ভেঙে মাঠে ঢুকে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দর্শকদের সরানোর চেষ্টা করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর ঘটে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা।

শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায় বহু প্রতীক্ষিত ফাইনাল। তারপর কেটে গেছে প্রায় এক বছর। কিন্তু সেই ম্যাচ আর মাঠে গড়ায়নি।

কক্সবাজারের ফুটবল অঙ্গনে এখন তাই প্রশ্ন, একটি ফাইনাল ম্যাচ শেষ করতে এত সময় লাগছে কেন?

নতুন টুর্নামেন্ট শেষ, পুরোনো ফাইনাল এখনো বাকি

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একই বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে আবারও ফুটবলের আয়োজন হয়েছে। এবার কক্সবাজার জেলা খেলোয়াড় সমিতির উদ্যোগে উপজেলা ফুটবল টুর্নামেন্ট।

রামু ও চকরিয়া উপজেলা একাদশের মধ্যকার ফাইনালও হয়েছে সেই মাঠে। টাইব্রেকারে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রামু।

অর্থাৎ প্রায় এক বছর আগে যে মাঠে একটি ফাইনাল ম্যাচ দর্শকদের বিশৃঙ্খলার কারণে শেষ করা যায়নি, সেই মাঠেই আরেকটি উপজেলা ফুটবল টুর্নামেন্ট সফলভাবে শেষ হয়েছে।

তবে এই আয়োজনের পরও আলোচনায় রয়ে গেছে আগের সেই ম্যাচ।

কারণ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপের ফাইনাল এখনো অমীমাংসিত।

টেকনাফ ও রামুর তৎকালীন দলের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বললে তাদের বক্তব্যে হতাশা স্পষ্ট।

তাদের দাবি, টুর্নামেন্টের জন্য দল গঠন, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি এবং অন্যান্য আয়োজনের পেছনে অর্থ ও সময় ব্যয় হয়েছে। কিন্তু শেষ ম্যাচটি না হওয়ায় পুরো আয়োজনটাই অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।

টেকনাফ উপজেলা ফুটবল দলের ম্যানেজার এবং বর্তমানে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন বলছেন, তারা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।

“আমরা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বারবার অমীমাংসিত খেলাটি শেষ করার জন্য কথা বলেছি। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও খেলাটি সম্পন্ন করা যায়নি।”

তার ভাষায়, শুধু একটি ম্যাচ স্থগিত হয়নি, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের অর্থ, শ্রম এবং প্রত্যাশা।

“আমাদের অনেক টাকা খরচ হয়েছে এই টুর্নামেন্ট পরিচালনা করতে। কিন্তু আমরা ফাইনাল খেলাটি শেষ করতে না পারায় অনেক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। আমরা ক্রীড়া সংগঠক, খেলোয়াড় এবং সংশ্লিষ্ট সকলেই ওই টুর্নামেন্ট নিয়ে মর্মাহত।”


কেন আটকে আছে ফাইনাল?

রামু দলের তৎকালীন সমন্বয়কারী জাবেদ ইকবালের অভিযোগ আরও সরাসরি।

তার মতে, আয়োজক কমিটির তৎকালীন আহ্বায়কের অদক্ষতার কারণেই টুর্নামেন্টটি বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ফাইনাল আর মাঠে গড়ায়নি।

“তৎকালীন টুর্নামেন্টে আয়োজন কমিটির আহ্বায়কের অদক্ষতার কারণে টুর্নামেন্টটি খুবই বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে অমীমাংসিত অবস্থায় রয়ে গেছে। আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি, ওই টুর্নামেন্ট সম্পন্ন করা হোক।”

এখন তার আরেকটি আশঙ্কা, আগের টুর্নামেন্ট শেষ না হলে নতুন জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ আয়োজনও জটিল হয়ে যেতে পারে।

জাবেদ ইকবাল মনে করেন, পুরোনো ফাইনালের নিষ্পত্তি না করে নতুন বছরের টুর্নামেন্ট শুরু করলে সেটি নতুন প্রশ্ন তৈরি করবে।

অর্থাৎ মাঠের একটি ম্যাচ এখন প্রশাসনিকভাবেও একটি অসমাপ্ত দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।


সেই দিনের ঘটনায় মামলা, ক্ষতি ২৬ লাখ টাকা

ফাইনাল স্থগিত হওয়ার ঘটনার পর বিষয়টি শুধু ক্রীড়া অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

ঘটনার দুই দিন পর, ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার সদর মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়।

জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বাদী হয়ে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা করেন।

এতে এজাহারনামীয় আসামি করা হয় শহরের বাইপাস সড়কের জেলখানা এলাকার মো. ইব্রাহিম বাবু এবং পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের স্টেডিয়ামপাড়ার শাফায়াত হোছাইনকে।

তারা ছিলেন টুর্নামেন্ট পরিচালনার ইজারাদার ও টিকিট বিক্রেতা। মামলায় আরও ৫০০ থেকে ৭০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।

অন্য মামলাটি করেন সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক রাজীব পাল।

সরকারি কাজে বাধা এবং পুলিশসহ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার অভিযোগে করা ওই মামলায় কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে।

তবে এক বছর পরও মামলাগুলোর অগ্রগতি নিয়ে খুব বেশি তথ্য সামনে আসেনি।

জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা এবং বর্তমানে জেলা ক্রীড়া সংস্থার এডহক কমিটির সদস্য মো. আলাউদ্দিন বলেন, মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তার কাছে নতুন কোনো আপডেট নেই।

তবে সেদিনের ঘটনায় স্টেডিয়ামে প্রায় ২৬ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বলে জানান তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেসব ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করা হয়েছে।


এবার কি শেষ হবে সেই ম্যাচ?

পুরোনো ফাইনালটি এখন শেষ করার তাগিদ তৈরি হয়েছে আরেকটি কারণে।

জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপের নতুন আসরের সময় ঘনিয়ে আসছে। ফলে পুরোনো টুর্নামেন্টের ফাইনাল ঝুলে থাকলে নতুন আসর শুরু করা নিয়েও তৈরি হতে পারে জটিলতা।

জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ম্যাচটি শেষ করতে চান।

“বর্তমানে আরও একটি জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ওই খেলাটি শেষ করতে না পারলে আরেকটা টুর্নামেন্ট শুরু করতে পারব না। এ কারণে আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই ফাইনাল খেলাটি শেষ করতে চাই।”

জেলা ক্রীড়া সংস্থার এডহক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মো. ইউনুসও বিষয়টি নিয়ে আশাবাদী।

তিনি বলেন, ফাইনাল শেষ করার ব্যাপারে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে।

“এই মাসে বা অক্টোবর মাসের মধ্যে আমরা টুর্নামেন্ট শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সম্ভাব্য নির্বাচন।

ইউনুসের ভাষায়, “এক মাসের মধ্যে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন হতে পারে। আমরা এডহক কমিটি বা নতুন কমিটি হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই টুর্নামেন্ট শেষ করা হবে।”

অর্থাৎ এক বছর ধরে যে ম্যাচটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়, সেটি শেষ করার জন্য এখন একটি সময়সীমার কথাও বলা হচ্ছে।


মাঠে ফিরেছে ফুটবল, ফিরবে কি সেই ফাইনাল?

সাম্প্রতিক উপজেলা ফুটবল টুর্নামেন্টের সফল আয়োজন পুরোনো সেই ঘটনার বিপরীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে।

একই স্টেডিয়ামে আবার দর্শক এসেছে। আবার দুটি দল ফাইনালে খেলেছে। আবার টাইব্রেকারে নির্ধারণ হয়েছে চ্যাম্পিয়ন।

এবার অবশ্য পরিস্থিতি এক বছর আগের মতো হয়নি।

এই টুর্নামেন্টের পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী ফাহিমুর রহমান মনে করেন, আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে উদ্যোগ।

তার বক্তব্য, জেলা খেলোয়াড় সমিতি যদি একটি বড় টুর্নামেন্ট সফলভাবে শেষ করতে পারে, তাহলে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপের অসমাপ্ত ফাইনালও শেষ করা সম্ভব।

“এটা একটা উদ্যোগের ব্যাপার। আমরা জেলা খেলোয়াড় সমিতি যদি এত বড় টুর্নামেন্ট সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারি, তাহলে ওই টুর্নামেন্ট সম্পন্ন করার জন্যও একটা উদ্যোগের ব্যাপার। আমরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”


এক ম্যাচের বাইরে যে প্রশ্নটি থেকে যায়

ফুটবলে একটি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ সাধারণত ফাইনাল।

সেখানেই নির্ধারিত হয় চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপের ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্তটাই হয়নি।

কে চ্যাম্পিয়ন হবে? টেকনাফ, না রামু?

এক বছর পরও তার উত্তর নেই।

এখানে শুধু একটি ম্যাচের ফলাফল আটকে নেই। আটকে আছে খেলোয়াড়দের পরিশ্রমের স্বীকৃতি, দলগুলোর অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, আয়োজকদের দায় এবং জেলার ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।

একই মাঠে নতুন টুর্নামেন্ট হয়েছে, নতুন চ্যাম্পিয়নও হয়েছে।

কিন্তু পুরোনো একটি ফাইনাল এখনো অপেক্ষায়। ক্রীড়া কর্মকর্তারা বলছেন, সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে সেটি শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এখন দেখার বিষয়, প্রায় এক বছর আগে যে ম্যাচটি দর্শকদের মাঠে ঢুকে পড়া ও পরবর্তী সহিংসতার কারণে থেমে গিয়েছিল, সেটি কি শেষ পর্যন্ত আবারও মাঠে ফিরবে?

নাকি কক্সবাজারের ফুটবল ইতিহাসে এটি থেকেই যাবে, একটি ফাইনাল, যার কোনো চ্যাম্পিয়ন নেই।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!