Site Logo
English
বিশ্লেষণ

উপকূলীয় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার ১১তম দরিদ্র জেলা

বাংলাদেশের একমাত্র উপকূলীয় জেলা হয়েও কক্সবাজার অগ্রগতি করতে পারেনি। গ্যাস আছে, সমুদ্র আছে, লবণ-মৎস্য আছে—তবু আমরা পিছিয়ে। প্রশ্ন হলো, অন্যরা পারলো আর আমরা পারলাম না কেন?

3 min read
উপকূলীয় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার ১১তম দরিদ্র জেলা

বিশ্লেষণ | বে ইনসাইট

উপকূল, লবণ, মৎস্য, পর্যটন ও প্রবাসী আয়ের মতো বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার এখনো দেশের ১১তম দরিদ্র জেলা—এমন বাস্তবতা তুলে ধরে দারিদ্র্য নিরসনে ডাটা-ভিত্তিক পরিকল্পনা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন এলজিইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

গত ২৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের ডিপিএইচই হলরুমে অনুষ্ঠিত ‘কেমন কক্সবাজার চাই’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনজুর সাদেক।

‘উপকূলীয় জেলা হয়েও আমরা পিছিয়ে’

তিনি বলেন, “পৃথিবীর প্রায় সব উপকূলীয় অঞ্চলই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের একমাত্র উপকূলীয় জেলা হয়েও কক্সবাজার অগ্রগতি করতে পারেনি। গ্যাস আছে, সমুদ্র আছে, লবণ-মৎস্য আছে—তবু আমরা পিছিয়ে। প্রশ্ন হলো, অন্যরা পারলো আর আমরা পারলাম না কেন?”

উপজেলাভিত্তিক দারিদ্র্যের চিত্র

মনজুর সাদেক জানান, দারিদ্র্যের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখনো বিপুল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।

তিনি বলেন, “উপজেলা পর্যায়ে এখনো ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে এই হার ৩১–৩২ শতাংশ, রামুতে প্রায় ৩০ শতাংশ।”

এলিট-কেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সমালোচনা

তার মতে, কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে ‘এলিট-কেন্দ্রিক’ চিন্তা প্রাধান্য পেয়েছে।

“আমাদের সামনে আসে এমপি, চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের এলিটরা। কিন্তু যাঁরা সামনে আসেন না, যাঁরা দৃষ্টির বাইরে—দরিদ্র মানুষ—তাঁদের কথা আমরা ভাবিনি। অথচ উন্নয়ন হওয়া উচিত তাঁদের জন্যই,” বলেন তিনি।

আবেগ নয়, দরকার ডাটা-ভিত্তিক চিকিৎসা

দারিদ্র্য নিরসনে আবেগ নয়, ডাটা-ভিত্তিক চিকিৎসা প্রয়োজন উল্লেখ করে মনজুর সাদেক বলেন, “এক্স-রে ছাড়া যেমন চিকিৎসা হয় না, তেমনি ডাটা ছাড়া উন্নয়নও হয় না। ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য নিয়ে জানতে হবে কোথায় হাত দিলে সবচেয়ে বেশি ফল পাওয়া যাবে।”

লবণনির্ভর অর্থনীতি ও কৃষি সংকট

লবণনির্ভর অর্থনীতিকে কক্সবাজারের দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, “অনেক উপজেলায় লবণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে লবণের কারণে অন্যান্য কৃষি উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মানুষ দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

বান্দরবান ও উত্তরাঞ্চলের উদাহরণ

তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য বান্দরবান জেলার উদাহরণ দেখিয়ে বলা যায়—কৃষি ও পশুপালনকে দক্ষতার সঙ্গে গড়ে তুলতে পারলে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

“বান্দরবান একসময় খুব পিছিয়ে ছিল, এখন তারা ১৯তম অবস্থানে। কারণ তারা কৃষি ও গবাদিপশু পালনে দক্ষতা তৈরি করেছে। আমাদের এখানেও সেটা সম্ভব ছিল, কিন্তু আমরা পারিনি,” বলেন মনজুর সাদেক।

প্রবাসী আয় আছে, কিন্তু দক্ষতার অভাব

প্রবাসী আয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কক্সবাজার থেকে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি রেমিট্যান্স আসে।

“কিন্তু আমাদের লোকজন স্কিলড নয়। সৌদি আরব, আবুধাবিতে আমাদের মানুষ আছে—কিন্তু দক্ষতা না থাকায় তারা সম্মানজনক জীবন পায় না। স্কিল ডেভেলপ করলে একই মানুষ আরও ভালো আয় করতে পারত,” বলেন তিনি।

দক্ষতা উন্নয়নে বরাদ্দের প্রস্তাব

সমাধান হিসেবে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

“এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের বরাদ্দের অন্তত ১০ শতাংশ দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় করে এবং ইউনিয়নভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ করা হয়, তাহলে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব,” বলেন মনজুর সাদেক।

ভোকেশনাল শিক্ষার ঘাটতি

হাতে-কলমে কাজ শেখানোর স্কুল ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে এখনো পর্যাপ্ত ভোকেশনাল ও স্কিল স্কুল নেই। অথচ সামান্য ইংরেজি, আচরণগত শিক্ষা ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিলে আন্তর্জাতিক সুযোগ তৈরি হয়।”

‘দারিদ্র্যমুক্ত কক্সবাজার অসম্ভব নয়’

সবশেষে মনজুর সাদেক বলেন, “ঠান্ডা মাথায়, ডাটা নিয়ে, সঠিক জায়গায় হাত দিতে পারলে কক্সবাজারকে দারিদ্র্যমুক্ত করা অসম্ভব নয়। সম্ভাবনা আছে—প্রয়োজন শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন।”

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!