ইয়াবা উদ্ধারের পর প্রশ্নের মুখে কক্সবাজার সরকারি কলেজের ছাত্রীনিবাসের নিরাপত্তা
সিসিটিভি, প্রবেশ-বের হওয়ার নজরদারি ও হোস্টেল সুপারের উপস্থিতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন; কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়ম আছে, ঘাটতি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।
কক্সবাজার সরকারি কলেজের ছাত্রীনিবাস ‘দোলনচাঁপা’ থেকে ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় এক ছাত্রী আটকের পর প্রশ্ন উঠেছে, আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও নজরদারির ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর।
গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কলেজ প্রশাসনের সহযোগিতায় ছাত্রীনিবাসে অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানায় কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ। এ ঘটনায় গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রীকে আটক করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবাগুলো একটি পার্সেলের মাধ্যমে ছাত্রীনিবাসে এসেছিল।
ঘটনার পর বে ইনসাইটের খোঁজে ছাত্রীনিবাসের সিসিটিভি, নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব, প্রবেশ-বের হওয়ার হিসাব এবং হোস্টেল সুপারের উপস্থিতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রীনিবাসে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য স্বাক্ষর খাতা থাকার কথা থাকলেও সেটির ব্যবহার সবসময় একইভাবে হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
‘সিসিটিভিগুলো নষ্ট’
ছাত্রীনিবাসের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বে ইনসাইটকে বলেন, হোস্টেলের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো নষ্ট।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গেটে নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও তাঁদের দায়িত্ব পালনে নিয়মিত নজরদারি নেই।
ওই শিক্ষার্থী বলেন, নিরাপত্তাকর্মীরা নির্দিষ্ট সময়ে দায়িত্বে থাকেন না এবং কে কখন প্রবেশ করছেন বা বের হচ্ছেন, তার নিয়মিত হিসাবও রাখা হয় না।
তবে আরেক আবাসিক শিক্ষার্থীর বক্তব্যে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র।
তিনি বলেন, ছাত্রীনিবাসে সিসিটিভি গেটের বাইরে রয়েছে। সেগুলো বর্তমানে সচল কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন।
প্রবেশ-বের হওয়ার জন্য স্বাক্ষর খাতা থাকার কথাও জানান তিনি।
তার ভাষায়, নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়ার সময় ওই খাতায় স্বাক্ষর করার কথা। তবে কখনও তদারকি কমে গেলে কেউ কেউ স্বাক্ষর না করেই বের হয়ে যেতে পারেন।
অর্থাৎ, নিয়ম থাকার কথা স্বীকার করলেও সেটি বাস্তবে কতটা ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, সেখানেই মূল প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে।
‘চাপ এলে নজরদারি বাড়ে’
দ্বিতীয় ওই শিক্ষার্থীর বক্তব্যে ছাত্রীনিবাসের নজরদারি নিয়ে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে বা কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়লে নিয়মকানুন কঠোরভাবে মানানো হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নজরদারিও আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
তার ভাষায়, সাম্প্রতিক ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনার পর ছাত্রীনিবাসে নজরদারি অনেক বেড়েছে এবং এখন প্রায় প্রতিটি বিষয়ে বেশি খেয়াল রাখা হচ্ছে।
হোস্টেল সুপার নিয়ে প্রশ্ন
ছাত্রীনিবাসের তদারকির ক্ষেত্রে হোস্টেল সুপারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এক শিক্ষার্থী দাবি করেন, হোস্টেল সুপার নিয়মিত সেখানে থাকেন না।
কলেজের অধ্যক্ষ আবুল হাসনাত মো. মফিজুল হকও স্বীকার করেছেন, নারী ছাত্রীনিবাসের সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষককে সেখানে সার্বক্ষণিক থাকার মতো আবাসিক ব্যবস্থা নেই।
অধ্যক্ষ বলেন, নারী হোস্টেলের জন্য নারী শিক্ষককে সুপারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সেখানে থাকতে রাজি না হওয়ায় সমস্যাটি তৈরি হয়েছে।
তার ভাষ্য, কয়েকজন নারী শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হলেও কেউ হোস্টেলে থাকতে চাননি।
‘মেট্রন সার্বক্ষণিক তদারকি করেন’
তবে হোস্টেল সুপার সার্বক্ষণিক না থাকাকে নিরাপত্তার ঘাটতি হিসেবে দেখছেন না কলেজ অধ্যক্ষ।
আবুল হাসনাত মো. মফিজুল হক বলেন, ছাত্রীনিবাসে মেট্রন রয়েছেন এবং তিনি সার্বক্ষণিক তদারকি করেন।
তিনি জানান, হোস্টেলের জন্য আলাদা ডরমিটরি বা আবাসিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
অধ্যক্ষের দাবি, সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ বিষয়ে কাজ চলছে।
সিসিটিভি নেই, অধ্যক্ষের বক্তব্য
সিসিটিভি নিয়ে শিক্ষার্থীদের বক্তব্যের সঙ্গে অধ্যক্ষের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
অধ্যক্ষ আবুল হাসনাত মো. মফিজুল হক বলেন, ছাত্রীনিবাসে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই।
তিনি জানান, ছাত্রীনিবাসে সিসিটিভি স্থাপনের জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।
অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের একজন যেখানে ক্যামেরা থাকার কথা বলেছেন এবং সেটি নষ্ট হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন, সেখানে অধ্যক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী হোস্টেলে বর্তমানে সিসিটিভি ক্যামেরাই নেই।
এই পার্থক্যটি পরিষ্কার করতে ছাত্রীনিবাসের বিদ্যমান ক্যামেরা ব্যবস্থার বিষয়ে সরেজমিন যাচাই প্রয়োজন।
প্রবেশ-বের হওয়ার রেজিস্টার নিয়ে দুই বক্তব্য
ছাত্রীনিবাসের প্রবেশ ও বের হওয়ার রেকর্ড নিয়েও একই ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
এক শিক্ষার্থী জানান, অনেক সময় কে ঢুকছে বা বের হচ্ছে তার লিখিত হিসাব থাকে না।
অন্য শিক্ষার্থী বলেন, প্রবেশ-বের হওয়ার জন্য স্বাক্ষর খাতা রয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী সেখানে স্বাক্ষর করতে হয়। তবে তদারকি কম থাকলে কেউ কেউ তা এড়িয়ে যেতে পারেন।
অধ্যক্ষের বক্তব্য আরও স্পষ্ট।
তিনি বলেন, হোস্টেলের গেটে রেজিস্টার রয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের সেখানে নাম ও সময় লিখে প্রবেশ করতে হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হোস্টেলের ভেতরেও রেজিস্টার রয়েছে।
ফলে এখানে প্রশ্নটি শুধু রেজিস্টার আছে কি না, তা নয়; বরং রেজিস্টার নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে কি না এবং সেই তথ্য কেউ যাচাই করছেন কি না।
ইয়াবার পার্সেল কীভাবে পৌঁছাল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পুলিশের তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বে ইনসাইটকে বলেন, অভিযানের সময় কলেজ প্রশাসনের উপস্থিতিতে ইয়াবা গণনা করা হয়। আটক ছাত্রী ২০ হাজার ইয়াবা তাঁর বলে স্বীকার করেছেন বলে জানান তিনি।
তবে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ এর চেয়ে বেশি ছিল কি না, অথবা এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্তের বিষয় বলে জানান ওসি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ছাত্রী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াবাগুলো তাঁর এক আত্মীয় পাঠিয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে তিনি নিয়মিতভাবে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করে বলতে চাননি ওসি।
তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে বের করতে হবে।
অন্য সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পার্সেলটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ছাত্রীনিবাসে পৌঁছেছিল এবং সেটি ওই ছাত্রীর কক্ষের খাটের নিচে রাখা হয়েছিল।
‘হোস্টেলের গাফিলতি এখনই বলা যাবে না’
ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় ছাত্রীনিবাস কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে চাননি ওসি।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে হোস্টেলের গাফিলতি বোঝা যাচ্ছে না। কারণ হোস্টেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছে।
সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট ছিল কি না, এ বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন। তাঁর বক্তব্য, তদন্ত কর্মকর্তা সরেজমিন তদন্ত করে এ বিষয়ে বলতে পারবেন।
অর্থাৎ, পুলিশের বর্তমান অবস্থান হলো, ইয়াবা কীভাবে ছাত্রীনিবাসে ঢুকল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সেটি তদন্তের বিষয়।
অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা অধ্যক্ষের
হোস্টেল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কলেজ অধ্যক্ষ।
তিনি বলেন, সুপার বা অন্য কারও বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এলে তা যথাযথভাবে দেখা হবে।
তবে বর্তমান ব্যবস্থায় ছাত্রীনিবাসে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে থাকা সুপার না থাকা, সিসিটিভি না থাকা এবং নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য, এসব প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান কতটা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
হোস্টেল সুপারকে পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য জানতে কলেজ ছাত্রীনিবাসের হোস্টেল সুপার কাজী কাসেমের সঙ্গে গত তিন দিনে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে বে ইনসাইট। তবে তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
ফলে সিসিটিভি ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা, নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্বের সময়সূচি, প্রবেশ-বের হওয়ার রেজিস্টার কীভাবে তদারক করা হয় এবং ইয়াবার পার্সেল ছাত্রীনিবাসে পৌঁছানোর পর কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ, এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!