Site Logo
English
শরণার্থী

‘ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটির কোনো চরিত্র নেই’, রোহিঙ্গা সংকটে নতুন করে ভাবার তাগিদ

“রিফিউজি ক্রাইসিস কখনো হোস্ট কান্ট্রির বার্ডেন হয় না, এটা গ্লোবাল প্রবলেম। এটাকে গ্লোবাল জাস্টিস, বার্ডেন শেয়ারিংয়ের আইডিয়া থেকে দেখতে হবে,” বলেন তিনি।

5 min read
‘ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটির কোনো চরিত্র নেই’, রোহিঙ্গা সংকটে নতুন করে ভাবার তাগিদ

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক গোলটেবিল আলোচনায় শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।

তাঁর ভাষায়, “ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি ইনকনসিস্টেন্ট, তাদের কোনো চরিত্র নাই।” তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশে এত বড় মানবিক সংকট সামাল দেওয়াও সম্ভব নয়।

‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কত দূর’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনার আয়োজন করে গণমাধ্যম বে ইনসাইট ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এমবোলডেন বাংলাদেশ।

আয়োজনটির মূখ্য আলোচক ছিলেন শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে আন্তর্জাতিক সহায়তা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও এখন সেই সহায়তার ভিত্তি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের প্রায় ৯৭ শতাংশ অর্থ পাওয়া গিয়েছিল। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৪৭ শতাংশে।

“এটা কী হচ্ছে? এটা কোয়ালিটি অব লাইফ, রিফিউজিদের কোয়ালিটি অব লাইফ ডিক্লাইন করছে এবং হোস্ট কমিউনিটির ওপর চাপ তৈরি করছে,” বলেন তিনি।

তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও বাস্তবতা হলো, এই সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মানবিক ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন।

‘রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়’

অধ্যাপক রাহমান বলেন, শরণার্থী সংকটকে শুধু আশ্রয়দাতা দেশের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বৈশ্বিক দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়।

“রিফিউজি ক্রাইসিস কখনো হোস্ট কান্ট্রির বার্ডেন হয় না, এটা গ্লোবাল প্রবলেম। এটাকে গ্লোবাল জাস্টিস, বার্ডেন শেয়ারিংয়ের আইডিয়া থেকে দেখতে হবে,” বলেন তিনি।

তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মূলত সংকটকে টিকিয়ে রাখার জন্য খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে; কিন্তু সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য যথেষ্ট রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে প্রত্যাবাসনকে সবচেয়ে ভালো বিকল্প মনে করেন এই গবেষক। তবে তাঁর প্রশ্ন, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি না হলে বাংলাদেশ কি বিকল্প পথগুলো নিয়ে ভাববে না?

“রিপাট্রিয়েশন হচ্ছে সবচেয়ে বেস্ট অপশন। কিন্তু যদি রিপাট্রিয়েশনের কন্ডিশনালিটি তৈরি না হয়, তার জন্য হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব? তখন আমাকে অলটারনেটিভ অপশনগুলো এক্সপ্লোর করতে হবে,” বলেন তিনি।

প্রত্যাবাসনের আগে তিন শর্ত

অধ্যাপক রাহমানের মতে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে, আইনি স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা।

তিনি বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করলে প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে প্রথমেই সংকট থেকে যায়।

“নাম্বার ওয়ান, আমার একটা লিগ্যাল রিকগনিশন লাগবে। তারপর তারা ওখানে যাবে, কোথায় যাবে? থাকবে কই? তার ভিটেমাটি যেগুলো ফেলে আসছে এগুলো কি তার জীবন নিরাপত্তা কি? তার সোশ্যাল লাইফ সিকিউরিটি এনশিওর করতে হবে।”

এর সঙ্গে মানবিক মর্যাদাকেও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর মতে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের শুধু প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় রেখে দিলে হবে না; তাদের বর্তমান জীবন, শিক্ষা ও জীবিকার বিষয়েও দীর্ঘমেয়াদি নীতি দরকার।

আরাকান আর্মিকে বাদ দিয়ে প্রত্যাবাসন?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা নিয়ে অধ্যাপক রাহমানের বড় প্রশ্ন রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ কোনো প্রত্যাবাসন চুক্তি করলেও সেটি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কারণ রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

“মিয়ানমার সরকারের তো অথরিটি নাই এই সিদ্ধান্ত এক্সিকিউট করার। পুরো রাখাইন স্টেটের প্রায় অধিকাংশ এলাকাই আরাকান আর্মির কন্ট্রোলে। তো যদি এক্সিকিউট করার সুযোগই না থাকে, চুক্তি কার সঙ্গে করলাম?”

আরাকান আর্মিকে রোহিঙ্গাদের পক্ষে অবস্থানকারী শক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

“এই আরাকান আর্মি কোনোদিন রোহিঙ্গাদের পক্ষে না,” বলেন তিনি।

তাঁর মতে, রাখাইনে প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ বুঝতে হলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিগুলোর সম্পর্কও বুঝতে হবে।

‘রোহিঙ্গাদের ব্লেমিং দ্য ভিকটিমস করা হচ্ছে’

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অপরাধ, মাদক বা সন্ত্রাসের অভিযোগকে পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করেন এই গবেষক।

তিনি বলেন, ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষের একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপরাধী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য থাকতেই পারে। কিন্তু কিছু মানুষের অপরাধের দায় পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো যায় না।

“আপনি ৫০০-১০ হাজার মানুষের জন্য ১৫ লাখ মানুষকে সন্ত্রাসী বলবেন? বলতে পারি না,” বলেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে এমন প্রচারণাকে তিনি ‘ব্লেমিং দ্য ভিকটিমস’ বা ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা হিসেবে দেখেন।

“এই মানুষগুলো এখানে বেড়াতে আসে নাই। এই মানুষগুলো একটা পরিস্থিতি হয়ে জেনোসাইড থেকে বাঁচার জন্য আসছে,” বলেন তিনি।

শুধু প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় না থেকে বিকল্প ভাবার পরামর্শ

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন অধ্যাপক রাহমান।

তিনি জানান, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র এক লাখ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনের একটি উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়াতেও মিয়ানমারের সামরিক নিপীড়নে বাস্তুচ্যুত মানুষদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর মতে, এসব সম্ভাবনাকে বাংলাদেশকে নীতিগতভাবে অনুসন্ধান করা উচিত।

“আমি থার্ড কান্ট্রি সেটেলমেন্ট কেন করব না?”, প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন প্রত্যাবাসনের বিকল্প হতে পারে, কিন্তু প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তা এতে শেষ হয়ে যায় না।

রোহিঙ্গাদের ‘প্রোডাক্টিভ’ করার আহ্বান

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন ধরে কেবল ত্রাণনির্ভর করে রাখার পরিবর্তে তাদের দক্ষতা ও শ্রমকে কাজে লাগানোর নীতির পক্ষে মত দেন এই গবেষক।

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জীবিকা ও উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন উদ্যোগের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও কাজ করার সক্ষমতা রয়েছে।

“এই মানুষগুলোকে কী করে প্রোডাক্টিভ করা যায়”, এটি নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন অধ্যাপক রাহমান। তাঁর মতে, মিয়ানমারের কারিকুলামে পড়াশোনা করলেও সেই শিক্ষার সনদ দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থেকে যাবে।

‘২৫ আগস্টের মৌসুমি উত্তেজনা দিয়ে সমাধান হবে না’

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশে বছরজুড়ে কার্যকর নীতি না থাকার সমালোচনা করে অধ্যাপক রাহমান বলেন, প্রতিবছর ২৫ আগস্ট এলে কিছুদিনের জন্য সংকটটি আলোচনায় আসে। এরপর আবার তা আড়ালে চলে যায়।

“আমরা প্রতি বছর ২৫শে আগস্ট যখন আসে আমরা একটু উত্তেজিত হয়ে উঠি, মৌসুমী উত্তেজনায় ভুগি আমরা। তারপর আমরা রোহিঙ্গাদের জন্য দরদ নিয়ে বসেছি, সারা বছর খোঁজ থাকে না।”

তাঁর মতে, গোলটেবিল, আলোচনা কিংবা সহানুভূতির বক্তব্যের বাইরে গিয়ে ফলাফলভিত্তিক নীতি প্রণয়ন জরুরি।

“ইফেক্টিভ আউটকাম বেসড, আমি একটা কিছু করলাম, যার আউটকামটা কী? আউটকাম বেসড ইফেক্টিভ পলিসি ফ্রেমিং খুব জরুরি।”

অধ্যাপক রাহমানের বক্তব্যের সারকথা হলো, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরে রাখলেও, মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় বিকল্প পথও খোলা রাখতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে শুধু ত্রাণনির্ভর ব্যবস্থাপনা নয়, রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, জীবিকা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য কার্যকর নীতি নিতে হবে।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!