Site Logo
English
ইনসাইট স্টোরি

‘আয়নাবাজি নয়’, তাহলে গাফিলতি কার?

এক ব্যক্তির পরিচয়ে আরেকজনের বিচার, মৃত্যুদণ্ড, কক্সবাজারের ‘সোনা মিয়া’ মামলায় তদন্ত থেকেে এ-পর্যন্ত যে প্রশ্নগুলো

10 min read
‘আয়নাবাজি নয়’, তাহলে গাফিলতি কার?

। সৌরভ দেব ।

কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ‘সোনা মিয়া’ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, বিচার হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে।

কিন্তু রায়ের পর যখন সেই নামের আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হলো, তখন বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সোনা মিয়া আর ২০২৬ সালের জুনে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।

পুলিশের তদন্ত বলছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে রমজান নামের একজন হয়েও অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে ‘সোনা মিয়া’ পরিচয় নিয়েছিলেন।

আর যাঁর পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই সোনা মিয়াকেই চার বছর পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

কক্সবাজার জেলা দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ ইউনূস জানান, ১২ আগস্ট আদালতও তদন্ত প্রতিবেদন ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ওই মামলার প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। অন্য কোনো মামলায় অভিযুক্ত না থাকলে তাঁকে চার শর্তে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তাঁকে বর্তমান ঠিকানা পরিবর্তন না করতে, আদালতের অনুমতি ছাড়া জেলা শহর বা দেশ ত্যাগ না করতে, মূল পাসপোর্ট বা এনআইডি কক্সবাজার সদর মডেল থানায় জমা দিতে এবং প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার থানায় হাজিরা দিতে বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রকৃত আসামি রমজানকে দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা হয়েছে।

তিনি বলেন, আসল প্রশ্ন হলো, একজন ব্যক্তি পরিচয় গোপন করতে পারলেন কীভাবে, আর রাষ্ট্রের তদন্ত ও এতগুলো স্তর পেরিয়ে সেই ভুল পরিচয় কীভাবে একজন নিরীহ মানুষের মৃত্যুদণ্ডের কারণ হয়ে উঠল?

সন্দেহটা পুলিশই জানিয়েছিল

ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, সোনা মিয়ার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ নতুন কোনো তথ্য নয়।

২০২০ সালের ২ মার্চ ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’র নাম দেওয়া হয়। তাঁর বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, ঠিকানা কক্সবাজারের কুতুবদিয়াপাড়া ও রামুর গর্জনিয়া।

কিন্তু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রেই লিখেছিলেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি।

সদর ও রামু থানা পুলিশকে দিয়ে অনুসন্ধান করেও পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি বলে উল্লেখ করা হয় ওই অভিযোগপত্রে।

অর্থাৎ, আদালতে মামলা যাওয়ার আগেই পুলিশ জানত, এই আসামির পরিচয় নিশ্চিত নয়।

তবু সেই পরিচয়েই মামলা চলেছে।

তাহলে তদন্ত থামল কোথায়?

এখানেই মূল প্রশ্ন।

একজন আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যাচ্ছে না, এ তথ্য তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতকে জানালেন। কিন্তু এরপর কী করা হয়েছিল?

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সোনা মিয়ার আইনজীবী মো. আব্দুল মান্নানের মতে, এখানেই তদন্তের সবচেয়ে বড় গাফিলতি।

তাঁর যুক্তি, পুলিশ চাইলে জন্মনিবন্ধনের সূত্র ধরে ওই ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় যাচাই করতে পারত। যাঁর জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করা হয়েছে, তাঁর বাড়িতে গিয়ে পরিবার, স্ত্রী, সন্তান, প্রতিবেশী, সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব ছিল।

প্রয়োজনে ছবি, আঙুলের ছাপ বা অন্যান্য ফরেনসিক তথ্যও মিলিয়ে দেখা যেত।

কিন্তু সেসবের কোনোটি না করেই মামলা এগিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

মান্নানের প্রশ্ন, “আপনি যদি সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন পান, তাহলে সোনা মিয়ার বাড়িতে যাবেন না কেন?”

তাঁর ভাষায়, তদন্তের কাজই হলো সন্দেহ দূর করা। অথচ এই মামলায় সন্দেহের কথা লিখে দেওয়ার পরও সেটি দূর করা হয়নি।

ছয় মাসের তদন্তে পরিচয় নিশ্চিত হলো না, চার বছরেও হলো না

আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয় সময়ের ব্যবধান নিয়ে। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে অভিযোগপত্র। ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ জামিন পেলেন।

এরপর তিনি পলাতক। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন। তারপর ২৩ জুন র‌্যাব রামু থেকে সোনা মিয়া নামের একজনকে গ্রেপ্তার করল।

অর্থাৎ, যে ব্যক্তিকে পুলিশ ২০২০ সালে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে শনাক্ত করতে পারেনি, তাঁর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেল না। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কয়েক মাসের মধ্যেই সেই নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হলো।

এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী মান্নান।

তাঁর প্রশ্ন, ২০২২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত যাঁকে খুঁজে পাওয়া গেল না, মৃত্যুদণ্ডের পর এত দ্রুত তাঁকে কীভাবে পাওয়া গেল?

তবে এর উত্তর হিসেবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রায়ের পর ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।

কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়ার পরও আরেক সুযোগ ছিল

বর্তমানে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া র‌্যাবের কাছে, থানায় কিংবা আদালতে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ওই মামলার আসামি নন বলে জানাননি।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য, কারাগারে যাওয়ার দুই দিন পর সোনা মিয়া বিষয়টি জেল সুপারকে জানান। জেল সুপার বিষয়টি আদালতকে জানানোর পর তদন্ত শুরু হয়।

এখানেও প্রশ্ন তোলেন ওসি আলী।

তিনি বলেন, যদি গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত সোনা মিয়া হন, তাহলে তিনি কেন গ্রেপ্তারের সময়ই নিজের পরিচয় নিয়ে আপত্তি তুললেন না?

আবার উল্টো প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। আইনজীবীরা বলছেন, কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর পরিচয় যাচাই করে যখন আগের আসামির সঙ্গে কোনো মিল পাওয়া গেল না, তখন কি বোঝা যায় না যে আগের তদন্তেই বড় কোনো ভুল হয়েছিল?

কারাগারের নথি খুলতেই দুই ব্যক্তির দুই পরিচয়

পুলিশ যখন ২০২০ ও ২০২৬ সালের কারাগারের তথ্য পাশাপাশি রাখে, তখন পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়।

২০২০ সালে গ্রেপ্তার ব্যক্তির বয়স ছিল ২৫ বছর। মায়ের নাম সোনারা বেগম, স্ত্রীর নাম আয়েশা। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি। দুই গাল ও ডান বাহুতে ক্ষতচিহ্ন ছিল।

২০২৬ সালের সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর। মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন, স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। এক ছেলে ও তিন মেয়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি। ডান বাহু, পেটের বাঁ পাশে ও পিঠের মাঝখানে তিল রয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই ব্যক্তির ছবি ও আঙুলের ছাপেও মিল পাওয়া যায়নি।

একই মামলার আরেক আসামিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনিও বর্তমান সোনা মিয়াকে চেনেন না বলে জানান।

তাহলে প্রশ্ন আরও সরল হয়ে যায়, এই যাচাইগুলো যদি এখন করা সম্ভব হয়, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কেন করা হলো না?

আরো যাচাই এর সুযোগ ছিলো কিনা?

এই প্রশ্নে আইনজীবী মান্নানের বক্তব্য হলো, আদালত তদন্তকারী সংস্থা ও রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে বিচার করে।

তদন্ত কর্মকর্তা যখন একটি পরিচয়ে চার্জশিট দেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা যখন সেই ব্যক্তিকেই আসামি হিসেবে শনাক্ত করেন, তখন আদালতের সামনে ওই পরিচয় নিয়ে আলাদা কোনো বিরোধ না উঠলে বিচার সেই কাঠামোর মধ্যেই এগোয়।

এই মামলায় সাক্ষীরাও আদালতে ‘সোনা মিয়া’কে শনাক্ত করেছেন।

তাই তদন্ত পর্যায়ের ব্যর্থতাই এখানে বড় প্রশ্ন বলে মনে করেন আইনজীবী।

তবে আদালতের সামনে তদন্ত কর্মকর্তার সেই লিখিত বক্তব্য ছিল, ‘সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি।’

এই তথ্য থাকা অবস্থায় মামলাটি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডে পৌঁছানো কীভাবে সম্ভব হলো, সেই প্রশ্নে মান্নানের বক্তব্য, কোনো আসামির পরিচয় নিশ্চিত না হলে তাঁকে চার্জশিট থেকে বাদ দিয়ে রাখা যেত। পরে প্রকৃত পরিচয় পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব ছিল।

তাঁর প্রশ্ন, পরিচয় নিশ্চিত নয় জেনেও কেন ওই নামেই বিচার এগিয়ে নেওয়া হলো?

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন করে থাকলে তাঁরও দায় আছে। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব ছিল সেই পরিচয় যাচাই করা।

কারণ রাষ্ট্রের হাতে একজন নাগরিকের পরিচয় যাচাই করার ক্ষমতা ও সুযোগ সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।

রমজান কোথায়?

পুলিশের তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম মো. রমজান।

তদন্তে আরও বলা হয়েছে, রমজান ও সোনা মিয়া একসময় একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছিলেন এবং পরে কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে থাকতেন। সেই সুযোগে রমজানের হাতে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের তথ্য আসে।

এরপর সেই পরিচয় ব্যবহার করেই ইয়াবা মামলায় গ্রেপ্তার হন রমজান, এমনটাই পুলিশের তদন্তের বক্তব্য।

কিন্তু রমজান এখন কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নানও প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকৃত আসামি রমজানকে এখনও কেন গ্রেপ্তার করা যায়নি।

স্ত্রী বলছেন, ‘আমার স্বামী কখনো জেলেও যাননি’

কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, তাঁর স্বামী কখনো কোনো মামলায় জড়াননি।

তিনি বলেন, রমজান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর স্বামীর পরিচয় ছিল। সেই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে তাঁরা জানতেন।

কিন্তু কয়েক বছর পর হঠাৎ তাঁর স্বামীকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করলে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁর নামে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে।

চার সন্তান নিয়ে স্বামীহারা অবস্থায় থাকা জান্নাতুলের জন্য এটি ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।

এখন আদালতের মুক্তির আদেশে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

‘আয়নাবাজি’ বললে কি দায় এড়ানো হবে?

কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী ঘটনাটিকে ‘আয়নাবাজি সিনেমাকেও হার মানায়’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ঘটনার নাটকীয়তা সত্যিই সিনেমার মতো।

একজনের পরিচয় অন্যজন ব্যবহার করেছেন। সেই পরিচয়ে মামলা হয়েছে। বিচার হয়েছে। সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। পরে সেই পরিচয়ের আসামিকে ধরতে গিয়ে পাওয়া গেছে অন্য একজনকে।

কিন্তু রাষ্ট্রের নথিতে এটি কোনো সিনেমা নয়।

এটি একজন মানুষের স্বাধীনতা, বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

তাই আইনজীবী মান্নান বলেন, ‘আয়নাবাজি’ শব্দটি ঘটনার নাটকীয়তা বোঝাতে পারে, কিন্তু দায় নির্ধারণ করতে পারে না।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে ভুল পরিচয়ের শুরুটা হয়েছিল একজনের প্রতারণা দিয়ে, সেটিকে এত দূর পর্যন্ত যেতে দিল কারা?

“আর যদি তদন্তের গাফিলতিই এই ভুল পরিচয়কে মৃত্যুদণ্ডের রায়ে পৌঁছে দিয়ে থাকে, তাহলে শুধু ভুল মানুষটিকে মুক্তি দেওয়া যথেষ্ট নয়।”

তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানস বড়ুয়া বলেন, গ্রেপ্তারের পর পুলিশ যখন নাম-ঠিকানা যাচাই করতে কক্সবাজার সদর থানায় পাঠায়, তখন পুলিশ জানায় ওই পরিচয় সঠিক নয়। পরে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করেও গ্রেপ্তার ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেননি।

মানস বড়ুয়া বলেন, এ অবস্থায় তিনি অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছিলেন যে আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে আটক রাখার আবেদন করেছিলেন।

জেল সুপার: নথি অনুযায়ীই বন্দিকে গ্রহণ করা হয়েছিল

কারাগারে যাওয়ার দুই দিনের মধ্যে সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন, তিনি ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলার আসামি নন।

বিষয়টি আদালতকে জানান জেল সুপার। এরপর আদালতের নির্দেশে তদন্ত শুরু করে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ।

জেল সুপার মোঃ ওবায়াদুর রহমান বলেন, কারাগারে কোনো বন্দিকে গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ, পরোয়ানা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রই মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সংশ্লিষ্ট মামলায়ও আদালতের নথিতে যে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল, সেই অনুযায়ী বন্দিকে কারাগারে গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “আদালত থেকে যে নথি ও আদেশ আসে, সেটির ভিত্তিতেই একজন বন্দিকে কারাগারে গ্রহণ করা হয়। কারাগারের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো মামলায় আসামি শনাক্ত করার সুযোগ নেই।”

তবে পরবর্তী সময়ে বন্দির পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, এ ক্ষেত্রে কারাগারে বন্দি গ্রহণের সময় পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে স্পষ্ট হবে।

শুরুটা ২০২০ সালে

ঘটনার শুরু ২০২০ সালের ২ মার্চ।

কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলায় দ্বিতীয় আসামি করা হয় ‘সোনা মিয়া’কে।

এজাহারে তাঁর বাবার নাম মৃত নজির আহমদ। বর্তমান ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া।

কিন্তু এই পরিচয় নিয়েই শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল পুলিশের।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পরিদর্শক মানস বড়ুয়া আদালতে অভিযোগপত্র দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশকে দিয়ে অনুসন্ধান করেও তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

তবু সেই ব্যক্তিকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। বরং মামলার বিচার চলতে থাকে।

মামলার রায় ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পরিচয়

২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর এই মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর এক আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। রায় ঘোষণা করেন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবদুর রহমান।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে নূর মোস্তফা এবং কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ার বাসিন্দা নজির আহমদের ছেলে সোনা মিয়া, যে পরিচয় নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের খুলু মিয়ার ছেলে আবদুল গফুর (৩৫) এবং মোহাম্মদ আলমের ছেলে মো. আইয়ুব ওরফে তৈয়ব।

অন্যদিকে, রামু উপজেলার রাজারকুল এলাকার মো. ইসলামের ছেলে আবদুর রহমানকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়।

Share this article

Leave a Comment

Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your thoughts!