‘আট মাস শিকলবন্দি রেখে কাজে বাধ্য করে’
‘নির্যাতনের’ পর ২৪ জেলেকে ফেরত দিলো আরাকান আর্মির

। বে ইনসাইট রিপোর্ট ।
‘আমাদের পায়ে শিকল বেঁধে দেয়। ৮-৯ মাস পর সেই শিকল আজ খুলেছে।’-মিয়ানমারের আরাকান আর্মির হাতে আটক থাকার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে এমনটাই জানিয়েছেন দেশে ফেরা জেলে ওমর ফারুক।
আরেক জেলে আব্দুল্লাহর বর্ণনাও প্রায় একই রকম। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের জলসীমার কাছাকাছি মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির সদস্যরা অস্ত্র ঠেকিয়ে তাঁদের আটক করে রশি দিয়ে বেঁধে মিয়ানমারে নিয়ে যায়। পরে সেখানে তাঁদের দিয়ে বেগুন-মরিচ চাষ, ভেঙে যাওয়া রাস্তাঘাট মেরামত ও বিভিন্ন কাজে বাধ্য করা হতো।
বুধবার মিয়ানমারের আরাকান আর্মির হাতে আটক ২৪ জেলে দেশে ফেরার পর তাঁদের মুখে উঠে এসেছে এমন নির্যাতন ও বন্দিজীবনের বর্ণনা।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উদ্যোগে বুধবার নাফ নদীর শূন্যরেখা দিয়ে ২৪ জেলেকে দেশে ফেরানো হয়। তাঁদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি এবং ছয়জন মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা।
বিজিবি বলছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে আরাকান আর্মির হাতে মোট ৪৩৪ জেলে আটক হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২২২ জন বাংলাদেশি এবং ২১২ জন এফডিএমএন। এ পর্যন্ত ৩৪৮ জনকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। এখনও ৮৬ জন আটক রয়েছেন।
‘পেছন থেকে অস্ত্র ধরে রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যায়’
দেশে ফেরা সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ বলেন, তাঁরা সেন্ট মার্টিনের কাছাকাছি জাহাজের পাশে জাল ফেলেছিলেন। তাঁর দাবি, তাঁরা মিয়ানমারের সীমানায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে যাননি।
আমরা বাংলাদেশ সীমার কাছাকাছি সেন্ট মার্টিনের জাহাজের কাছে জাল মেরেছিলাম। একদম বার্মার সীমানায় না, কাছাকাছি জায়গায় ছিলাম আমরা। কিন্তু তখন আরাকান আর্মি এসে আমাদের সবাইকে পেছন থেকে অস্ত্র ধরে একদিকে করে রাখে। এরপর আমাদেরকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে।
পরে তাঁদের মিয়ানমারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে জানান তিনি।
“আমরা ইচ্ছে করে এখানে আসিনি। জাল মারতে মারতে সীমান্তের কাছাকাছি চলে এসেছি। তবুও আমরা বাংলাদেশ সীমানার মধ্যেই ছিলাম। জোয়ার-ভাটার জন্য হয়তো কিছুটা সীমান্তের বাইরে চলে গেছিলাম,” বলেন আব্দুল্লাহ।
মিয়ানমারে নেওয়ার পর তাঁদের বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত করা হতো বলেও জানান তিনি।
আব্দুল্লাহ বলেন, “আমাদেরকে সেখানে ধরে নিয়ে বেগুন চাষ করতে দিত, মরিচ চাষ করতে দিত। মানে সবজি জাতীয় জিনিস চাষ করার জন্য নিয়ে যেত। আর সেখানে যে রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে সেগুলো ঠিক করার জন্য নিয়ে যেত। যুদ্ধ বা থাকার জন্য গাছ কাটার মতো বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করা হতো।”
তাঁদের মংডুর একটি কারাগারে রাখা হয়েছিল বলে জানান এই জেলে।
‘অনেক মারধর করে, পায়ে শিকল পরিয়ে দেয়’
আরেক জেলে ওমর ফারুক বলেন, মাছ ধরার সময় দুটি স্পিডবোট এসে তাঁদের ঘিরে ফেলে।
“আমরা জাল মারতে গিয়েছিলাম, জাল টানা অবস্থায় দুইটা স্পিডবোট আসে। এসে আমাদেরকে অস্ত্র দিয়ে ঘিরে ফেলে। তারা আমাদের বোটে ওঠে। এরপর জিজ্ঞেস করে আমরা কেন এখানে জাল মারতে এলাম,” বলেন তিনি।
ওমর ফারুকের অভিযোগ, আটকের পর তাঁদের মারধর করা হয়।
“আমাদের হাত বেঁধে ফেলে, অনেক মারধর করে। মাথায় বাড়ি মারে, কোমরে লাথি মারে,” বলেন তিনি।
এরপর প্রায় এক ঘণ্টা নৌকা চালিয়ে তাঁদের একটি তীরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান তিনি। সেখানে ভিডিও ধারণের সময় কী বলতে হবে, সেটিও তাঁদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর দাবি।
তারা বলে তাদের শেখানোর মতো কথা বলতে। আমাদেরকে নিয়ে এগিয়ে জেলে বন্দি করে রাখে ৮-৯ মাস ধরে। আমাদের পায়ে শিকল বেঁধে দেয়। ৮-৯ মাস পর সেই শিকল আজ খুলেছে।
ধাপে ধাপে জেলেদের ফেরানোর উদ্যোগ
বিজিবি জানিয়েছে, মানবিক বিবেচনায় আটক জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনতে মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করে ধাপে ধাপে তাঁদের প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বুধবার বিজিবির একটি প্রতিনিধিদল নাফ নদীর শূন্যরেখায় আরাকান আর্মির কাছ থেকে ২৪ জেলেকে গ্রহণ করে টেকনাফ জেটিঘাটে নিয়ে আসে।
বিজিবির টেকনাফ ব্যাটালিয়ন-২-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বিজিবির দায়িত্ব। মানবিক সংকট মোকাবেলায় কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে এই জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
ফেরত আসা জেলেদের পরিচয় স্থানীয় উপজেলা প্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
এখনও আটক ৮৬ জন
বিজিবির দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আরাকান আর্মির হাতে বাংলাদেশি ও এফডিএমএন মিলিয়ে ৪৩৪ জন জেলে আটক হয়েছেন।
এর মধ্যে বাংলাদেশি ২২২ জন এবং এফডিএমএন ২১২ জন।
ফেরত এসেছেন মোট ৩৪৮ জন- যাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি ১৫৭ জন এবং এফডিএমএন ১৯১ জন। এখনও ফেরেননি ৮৬ জন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি ৬৫ জন এবং এফডিএমএন ২১ জন।
বিজিবি জানিয়েছে, অবশিষ্ট আটক জেলেদেরও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তবে দেশে ফেরা জেলেদের বর্ণনায় আটকের সময় মারধর, শিকল পরিয়ে রাখা এবং বিভিন্ন কাজে বাধ্য করার যে অভিযোগ এসেছে, তা নিয়ে আরাকান আর্মির বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
Share this article
Leave a Comment
Comments (0)
No comments yet. Be the first to share your thoughts!